ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

আশ্রয়ণ প্রকল্পের ১৪২ ঘরের মধ্যে ৯২টিই তালাবদ্ধ

আশ্রয়ণ প্রকল্পের ১৪২ ঘরের মধ্যে ৯২টিই তালাবদ্ধ
×

গাজীপুরের নয়াপাড়ায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের দুই-তৃতীয়াংশ ঘরই খালি পড়ে আছে। গতকাল মঙ্গলবার তোলা সমকাল

ইজাজ আহ্‌মেদ মিলন, গাজীপুর

প্রকাশ: ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৮:২৭ | আপডেট: ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১০:০৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

দূর্বাঘাসে ঢাকা সবুজ প্রশস্ত মাঠ। মাঠের তিন দিকে ইটের দেয়াল আর রঙিন টিন দিয়ে ছাওয়া সারি সারি ঘর। কোনো কোনো ঘরের সামনে আগাছার ঝোপ আবার কোনোটিকে জড়িয়ে আছে লাউ আর শিমের ডগা। তালাবদ্ধ ঘরগুলোর সামনে জমে আছে ময়লার স্তূপ। মরিচা ধরেছে ঝুলে থাকা তালাগুলোয়। ঘরের দরজা আছে, জানালা আছে, আছে এক চিলতে উঠান। শুধু নেই বাসিন্দা। গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার নয়াপাড়া আশ্রয়ণ প্রকল্প এলাকার দৃশ্য এটি। 

জানা যায়, উদ্বোধনের পর থেকেই এ আশ্রয়ণ প্রকল্পে জমি ও ঘর বরাদ্দ পাওয়া বেশির ভাগ বাসিন্দাই সেখানে থাকেন না। ঘর তালাবদ্ধ করে রেখেছেন। এ সুযোগে সন্ধ্যা নামলেই নির্জন বারান্দায় মাদকসেবীদের আড্ডা জমে ওঠে। স্থানীয়রা বলছেন, তৎকালীন দায়িত্বশীল কর্তাব্যক্তিদের ম্যানেজ করে সম্পদশালী অনেকেই এসব ঘর বরাদ্দ নিয়েছিলেন। প্রকৃত ভূমিহীনদের বঞ্চিত করে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর নেওয়া পর্যন্তই শেষ, বরাদ্দপ্রাপ্ত অনেকে একটি রাতও যাপন করেননি ওই সব ঘরে। বর্তমানে ওই প্রকল্পে অর্ধশতাধিক পরিবার তাদের বরাদ্দপ্রাপ্ত ঘরে বসবাস করছেন।

ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের জৈনা বাজার থেকে সাড়ে ৫ কিলোমিটার পশ্চিমে শ্রীপুর উপজেলার নয়াপাড়া গ্রামে আশ্রয়ণ প্রকল্প-২ এর অবস্থান। প্রায় ২৫ বিঘা জমির ওপর ১৪২টি ঘর তৈরি করে দেওয়া হয়। আছে একাধিক প্রশস্ত রাস্তা, মসজিদ, বিদ্যালয়, খেলার মাঠ, কমিউনিটি সেন্টার, পুকুর, কবরস্থানসহ নানা নাগরিক সুবিধা। ২০২৩ সালের ২৩ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকল্প উদ্বোধন করা হয়। ঘর বুঝিয়ে দেওয়া হয় বরাদ্দপ্রাপ্ত ১৪২ জনকে। 

ভিটে-মাটিহীন, বিধবা, ভিক্ষুক তথা গৃহহীন, ভূমিহীন নারী-পুরুষের পুনর্বাসনের জন্য এ প্রকল্প নেওয়া হয়। তাদের ২ শতাংশ জমিসহ দুই কক্ষের ঘরগুলো লিখে দেওয়া হয়। তাদের পাশাপাশি সমাজের সম্পদশালীরাও কৌশলে অনেক ঘরের মালিক বনে যান। অন্যদিকে, প্রকৃত ভূমিহীন গৃহহীনদের অনেকে বঞ্চিত হন। উদ্বোধনের দিন ঘর বুঝে নিলেও অন্তত ৯২টি পরিবার পরে এখানে কখনও আসেনি। ঘরসহ ২ শতাংশ করে জমিও লিখে দেওয়া হয়েছে। অথচ সেগুলো এখন একেবারেই খালি পড়ে আছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, প্রতিটি ঘরের জন্য সরকার বরাদ্দ দেয় দুই লাখ ৬৪ হাজার টাকা। কিন্তু এখানে প্রতিটি ঘর নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৩ লাখ টাকার বেশি। জেলা প্রশাসকের স্থানীয় তহবিল থেকে বাকি অর্থের জোগান দেওয়া হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ব্যয় হয়েছে চার কোটি ২৬ লাখ টাকা। 

আশ্রয়ণ প্রকল্পে একটি বিদ্যালয় থাকলেও সেটি এক দিনের জন্য খোলা হয়নি। শিক্ষার্থী নেই, শিক্ষক নেই। শুধু পড়ে আছে অবকাঠামো। এটি চালু করার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে জানান বাসিন্দারা।

গতকাল মঙ্গলবার শ্রীপুর উপজেলার গাজীপুর ইউনিয়নের নির্জন পল্লী নয়াপাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ১৪২টি ঘরের মধ্যে ৯২টিই তালাবদ্ধ। এসব ঘরে বরাদ্দপ্রাপ্তরা সেখানে থাকেন না। নছুম উদ্দিন নামে আশ্রয়ণ কেন্দ্রটির এক বাসিন্দা বলেন, লোভ সামলাতে না পেরে অনেক ধনী মানুষও এখানে ঘর নিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত তারা আর আসেননি। ওভাবেই পড়ে আছে ঘরগুলো। 

জয়নব বেগম নামে এক বাসিন্দা জানান, প্রকৃত ভূমিহীনরা বরাদ্দ না পেলেও অনেকের নিজের ঘরবাড়ি থাকার পরও তারা এখানে ঘর নিয়েছেন। বহু ভূমিহীন রয়েছে আশপাশে। এখানে থাকার জন্য তারা আগ্রহীও। পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে থাকা ঘরগুলো দিয়ে দিলে তারা উপকৃত হবে। 

নয়াপাড়া আশ্রয়ণ প্রকল্প সমিতির সভাপতি আবদুল লতিফ বলেন, হিসাব করে দেখেছি ৮০ জন বাসিন্দা এখানে আসেন না। তাদের ঘর তালাবদ্ধ। কেউ কেউ চাচ্ছেন দখলদারিত্ব বিক্রি করে ফেলতে। কিন্তু কোনোভাবেই আমরা সেটা হতে দেব না। 

তিনি আরও বলেন, সরকার বিশাল এক মসজিদ করে দিয়েছে আশ্রয়ণ প্রকল্পে; অথচ সেটি পরিচালনার মতো অবস্থাও নেই এখন। অল্পসংখ্যক বাসিন্দা হওয়াতে মসজিদের জন্য ইমাম মোয়াজ্জিন নিয়োগ দিলে বেতন দেওয়া সম্ভব হবে না বলে জানান তিনি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা জানান, আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর পেয়েছেন কাজল মিয়া নামে এক ব্যক্তি। তাঁর ঘর নম্বর ৩৩। অন্যত্র কাজলের নিজের বাড়ি আছে। সেই বাড়িতে অনেকগুলো কক্ষ আছে, যেগুলো তিনি ভাড়া দিয়ে রেখেছেন। এ বিষয়ে কাজল মিয়ার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। ১২৬ নম্বর ঘরটি বরাদ্দ পেয়েছেন মো. সোহাগ, ২৯ নম্বর ঘরের মালিক রীমা আক্তার। উদ্বোধনের পর তারা নিজ নিজ ঘর বুঝে নিয়েছিলেন। তারপর থেকে আর একদিনও ঘরে থাকেননি। 

স্থানীয় কেউ কেউ বলছেন, আশ্রয়ণ প্রকল্পটি এমন নিভৃত পল্লীতে করা হয়েছে যে, সেখানে কর্মসংস্থানের কোনো পথই নেই। ইচ্ছা করলেই এখানকার বাসিন্দারা উপার্জনের জন্য আশপাশে যেতে পারেন না। অর্থাৎ আশপাশে কাজের কোনো ক্ষেত্র নেই। 

তবে অন্য একটি পক্ষ বলছে, এই অভিযোগ সত্য নয়। নয়াপাড়ার আশপাশে অন্তত ৩০টি শিল্পকারখানা রয়েছে। আশ্রয়ণের সেখানে কাজ করতে পারেন। 

শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সজীব আহমেদ জানান, আমরা একটি তালিকা তৈরি করেছি। যারা ঘরে থাকেন না তাদের আমাদের পক্ষ থেকে ঘরে থাকার জন্য বলা হবে। যদি না থাকেন, তাহলে অন্য ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, জমিসহ ঘরগুলো বরাদ্দপ্রাপ্তদের যার যার নামে রেজিস্ট্রি করে দেওয়া। এ কারণে সহসাই কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যাচ্ছে না।

এ বিষয়ে গাজীপুর জেলা প্রশাসক মো. আলম হোসেন বলেন, অল্প কদিন আগেই আমি জেলা প্রশাসক হিসেবে গাজীপুরে যোগদান করেছি। ওই আশ্রয়ণ প্রকল্প সম্পর্কে আমার জানা নেই। অভিযোগগুলোর বিষয়ে খোঁজ নিয়ে দ্রুতই ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেব। 

 

আরও পড়ুন

×