ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

চট্টগ্রাম শহর রক্ষা বাঁধের জমিতে অনেকের নজর

চট্টগ্রাম শহর রক্ষা বাঁধের জমিতে অনেকের নজর
×

চট্টগ্রাম শহর রক্ষা বাঁধ নির্মাণের পর আপৎকালীন রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সংরক্ষিত জমি। সড়কের পাশে হওয়ায় নানা ধরনের যানবাহন রাখা হয়। এই জমিই বরাদ্দ নেওয়ার জন্য চলছে প্রতিযোগিতা। সম্প্রতি হালিশহর সাগরিকা স্টেডিয়াম এলাকা থেকে তোলা -সমকাল

আহমেদ কুতুব, চট্টগ্রাম

প্রকাশ: ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৮:০৬ | আপডেট: ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৮:৪১

| প্রিন্ট সংস্করণ

বন্দরনগরী চট্টগ্রামে ৪০ হাজার টন ক্ষমতার এলপিজি প্লান্ট করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। এ লক্ষ্যে চট্টগ্রাম শহর রক্ষা বাঁধের ৫০ একর জমি বরাদ্দ চেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। বিপিসির তরফে এরই মধ্যে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে চিঠিও দেওয়া হয়েছে। 

শুধু বিপিসিই নয়; এই বাঁধের জমি লিজ নিতে হাইকোর্টে রিট করে বসেন নগরের হালিশহর হাউজিং এস্টেটের বাসিন্দা জামাল উদ্দিন। তিনি ৫০ শতাংশ জমি ইজারা চেয়ে চট্টগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডে (পাউবো) আবেদনও করেছিলেন। তবে বাঁধের জন্য সংরক্ষিত জমি ইজারা না পেয়ে জামাল হাইকোর্টে রিট করেন। যদিও তিনি দীর্ঘদিন ধরে এ জমি দখল করে ট্রাক, এক্সক্যাভেটর ডিপো বানিয়ে ব্যবসা করছিলেন। প্রতি মাসে আয় করতেন লাখ টাকা। তাঁর মতো ১৪৫ কোটি টাকা মূল্যের প্রায় ১৪ একর জমি দখলে রেখেছেন নুরুল হুদা চৌধুরী নামে এক ব্যক্তি। তিনি এ জমির দখল না ছাড়তে এবং স্থায়ী বরাদ্দ পেতে চট্টগ্রাম আদালতে মামলা করেছেন। এভাবে তাদের মতো অনেকেই বাঁধের জমি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইছেন।

১৯৭০ সালে চট্টগ্রাম শহর রক্ষা বাঁধ নির্মাণের জন্য দক্ষিণ পতেঙ্গা, দক্ষিণ কাট্টলী ও উত্তর হালিশহর এলাকায় ৬০১ দশমিক ৭৯ একর জমি অধিগ্রহণ করে সরকার। বাঁধ নির্মাণের পর আপৎকালীন রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বাকি জমি সংরক্ষিত রাখা হয়। এখন এক হাজার ২০০ কোটি টাকার ১১৭ একর জমির ওপর নজর পড়েছে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের। বর্তমানে এ মৌজায় প্রতি শতক জমি ১০ থেকে ১১ লাখ টাকায় বেচাকেনা হচ্ছে। গড়ে ১০ লাখ টাকা করে ধরলেও এ সম্পত্তির মূল্য দাঁড়ায় ১ হাজার ১৭০ কোটি টাকা।

পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী শওকত ইবনে সাহীদ বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে চট্টগ্রাম শহরকে রক্ষায় এসব জমি অধিগ্রহণ করে সরকার। এখন আপৎকালীন সংরক্ষিত বাঁধের জমি নিয়ে অস্বাভাবিক দেনদরবার করছে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। তিনি বলেন, যে কোনো নাগরিক লিজ পেতে আবেদন করতে পারেন। লিজ পেতে হাইকোর্টে নজিরবিহীন রিটও করেছেন কেউ। বাঁধের জমিতে কী এমন আছে যে, সবাই বরাদ্দ পেতে মরিয়া হয়ে গেছেন। 

জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ড. শাহাদাৎ হোসেন বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য এলপিপি প্ল্যান্ট করতে বিপিসির জমি প্রয়োজন। পাউবোর অব্যবহৃত জমি পড়ে থাকায় সেখান থেকে ৫০ একর বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। সেখানে ৪০ হাজার টন ক্ষমতাসম্পন্ন এলপিজি টার্মিনাল ও স্টোরেজ নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে তারা। 

বাঁধের জমিতে নজর কেন বিপিসির
দেশে পাইপলাইনে গ্যাসের সংযোগ সীমিত হওয়ায় এলপিজির চাহিদা বাড়ছে। দেশে এখন বোতলজাত এলপি গ্যাসের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ১৭ লাখ টন। ২০৩০ সালে এ চাহিদা ৩০ লাখ টনে পৌঁছাবে। এ চাহিদার বিপরীতে সরকারিভাবে এলপিজি সরবরাহের পরিমাণ মাত্র ১ শতাংশ। বাকি ৯৯ শতাংশ এলপিজি বেসরকারি এলপিজি প্রতিষ্ঠান সরবরাহ করছে। এ প্রেক্ষাপটে সরকারিভাবে এলপিজির অংশীদারিত্ব বাড়ানো, সাশ্রয়ী মূল্যে সরবরাহ ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশের অভ্যন্তরে আমদানিনির্ভর এলপিজি প্লান্ট স্থাপনের জন্য বিপিসি পরিকল্পনা নিয়েছে। 

গত ৩০ অক্টোবর পাউবোতে পাঠানো চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, দেশের বন্দর এলাকায় এলপিজি প্লান্ট স্থাপন করা হলে স্বল্প পরিবহন খরচে রেফ্রিজারেটেড এলপিজি কিংবা প্রেসারাইজড এলপিজি আমদানি করা সম্ভব হবে। তাই চট্টগ্রাম নগরীর দক্ষিণ কাট্টলীর পানি উন্নয়ন বোর্ডের মালিকানাধীন ১০২ দাগের ২৫ একর এবং ৩২৩ দাগের ৩৩ দশমিক ৫১ একর অব্যবহৃত জমি বরাদ্দ চেয়েছে বিপিসি। 

দুষ্টচক্রের বদনজর 
শহর রক্ষা বাঁধের জমি দখল করে ট্রাক, কার্ভাডভ্যান ও লরি ডিপো তৈরি করেন নগরের হালিশহর হাউজিং এস্টেটের বাসিন্দা জামাল উদ্দিন। দুই যুগ ধরে ৫০ শতক জমিতে ভাড়া বাণিজ্য করে আসছিলেন তিনি। মাসে দুই-তিন লাখ টাকা ভাড়া হাতিয়ে নিতেন। গত জুলাইয়ে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের পর তাঁর দখল হাতছাড়া হয়ে যায়। এর পর তিনি অধিগ্রহণ করা পাউবোর জমি লিজ পেতে  হাইকোর্টে রিট করেন। যদিও পাউবো উল্লেখ করে, সরকারি জমি ইজারা পেতে যে কোনো নাগরিক আবেদন করতে পারেন। আবেদন করলেই ইজারা দিতে হবে– এমন বাধ্যবাধকতা নেই। 
এ ছাড়া পাহাড়তলীর বাসিন্দা নুরুল হুদা চৌধুরীও বাঁধের জমির দখল না ছাড়তে চট্টগ্রাম আদালতে মামলা করেন। হুদা ১৩ দশমিক ৬৫ একর জমি অবৈধ দখলে রেখেছেন। এ জায়গায় তিনি লরি, কার্ভাডভ্যান ডিপো তৈরি করে ভাড়া বাণিজ্য করে আসছেন। দখল হওয়া এ জমির বর্তমান বাজার দর ১৩৫ কোটি টাকা। 

দখলদার জামাল উদ্দিন বলেন, এ জমি আমাদের পূর্বপুরুষের। অধিগ্রহণ করলেও এখানে বাঁধ দেওয়া হয়নি। তাই আমরা এ জমি ব্যবহার করে আর্থিকভাবে লাভবান হতাম। কয়েক মাস আগে আমাদের উচ্ছেদ করে দেয়। তাই বৈধভাবে লিজ পেতে আবেদন করি। না দেওয়ায় হাইকোর্টে রিট করেছি। নুরুল হুদা চৌধুরী বলেন, এগুলো আমাদের জমি। অধিগ্রহণ করলেও বাঁধ না করায় আমরা এ জমির মালিকানা ছাড়ব না। তাই মামলা করেছি।  
 

আরও পড়ুন

×