লোভের ফাঁদে কৃষক, শেষে জমির বিপর্যয়
ফসলি জমির মাটি যাচ্ছে ইটভাটায়
ছবি: সমকাল
উলিপুর (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৬:১২
উলিপুর উপজেলায় প্রথমে বাড়তি আয়ের লোভ দেখিয়ে কৃষকদের ফাঁদে ফেলা হচ্ছে। পরে পাশের জমি গভীর করে মাটি কেটে চাষের অনুপযোগী করে তোলা হচ্ছে তাদের ক্ষেত। এতে নিরুপায় হয়ে নিজের জমির মাটিও ইটভাটার কাছে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকরা। এভাবে অবাধে ফসলি জমির উর্বর মাটি কেটে নেওয়ায় একদিকে যেমন কৃষি উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে ব্যাপক হুমকির মুখে পড়ছে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য।
উপজেলায় বর্তমানে ২০টি ইটভাটা রয়েছে। এর মধ্যে অধিকাংশ ইটভাটা তবকপুর, দুর্গাপুর, ধামশ্রেণী, বুড়াবুড়ি ও পৌরসভা এলাকায় অবস্থিত। পরিবেশ আইন লঙ্ঘন করে অবাধে ফসলি জমির উপরিভাগের উর্বর মাটি কেটে এসব ইটভাটায় ব্যবহার করা হচ্ছে। বিভিন্ন ইউনিয়নের আবাদি জমি থেকে ভেকু দিয়ে দুই ফুট গভীর পর্যন্ত উর্বর মাটি কেটে নেওয়া হচ্ছে। এক যুগ ধরে কোনো বাধা ছাড়াই এ মাটি কাটার কাজ চলছে। ইটভাটার সংখ্যা ও ইটের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাটা মালিকরাও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। এতে জমির উর্বরতা কমে যাচ্ছে, কৃষি উৎপাদন কমে যাচ্ছে এবং পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, অভাবী কৃষকদের বাড়তি আয়ের লোভ দেখিয়ে ফসলি জমির মাটি কিনে নেওয়া হচ্ছে। এতে ইতোমধ্যে কয়েকটি ইউনিয়নে প্রায় সাত হেক্টর আবাদি জমি নিচু হয়ে খালে পরিণত হয়েছে। বাড়তি আয়ের আশায় অনেক কৃষক নিজের জমির মাটি বিক্রি করছেন। এতে পাশের জমির মালিকরা বিপদে পড়ছেন। গভীর করে মাটি কাটার ফলে পাশের জমি উঁচু হয়ে চাষের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। তখন বাধ্য হয়ে সেই জমির মালিককেও মাটি বিক্রি করতে হচ্ছে।
পৌরসভার জোনাইডাঙ্গা গ্রামের জাফর আলী ও আকবর আলী বলেন, ‘বাড়তি আয়ের আশায় আমরা জমির মাটি বিক্রি করছি। এক বিঘা জমির দুই-তিন ফুট মাটি বিক্রি করে ৪০-৫০ হাজার টাকা পাওয়া যায়। এতে জমির উৎপাদন ক্ষমতা কমে যাচ্ছে–এটি আমরা জানতাম না।’
সরদারপাড়া গ্রামের শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘চারপাশের জমি থেকে গভীর করে মাটি কাটায় আমার জমি উঁচু হয়ে চাষের অযোগ্য হয়ে গেছে। পরে বাধ্য হয়ে আমিও ইটভাটায় মাটি বিক্রি করেছি।’
সচেতন মহলের মতে, এভাবে মাটি কাটা চলতে থাকলে একসময় ওই ইউনিয়নগুলোয় আবাদি জমি আর থাকবে না। সব জমি খাল বা নিচু জমিতে পরিণত হবে। কৃষকরা সচেতন না হওয়ায় নিজেরাই নিজেদের ক্ষতি করছেন।
ট্রাক্টরচালক জাকির হোসেন বলেন, ‘ভাটার মালিক মাটি কিনেছেন, আমরা শুধু পরিবহন করছি। চার দিন ধরে ছয়টি ট্রাক্টর দিয়ে মাটি আনা-নেওয়া করছি।’
ইটভাটার মালিক মফিজল হক বলেন, ‘জমির মালিকদের কাছ থেকে প্রতি হাজার মাটি দুই হাজার থেকে দুই হাজার ২০০ টাকায় কিনি।’ এটি আইনসিদ্ধ কিনা—প্রশ্ন করলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান।
পরিবেশকর্মী ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তুহিন ওয়াদুদ বলেন, ‘জমির উপরিভাগের উর্বর মাটি কেটে ফেললে উৎপাদন কমবে, খাদ্য ঘাটতি বাড়বে এবং জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. মোশারফ হোসেন বলেন, ‘মাটির উপরিভাগে থাকা পুষ্টি উপাদান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এটি অত্যন্ত ক্ষতিকর ও অপরাধমূলক কাজ। সরেজমিনে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সহকারী কমিশনার (ভূমি) মেহেদি হাসান বলেন, ‘আমি সরেজমিনে গিয়ে বিষয়টি দেখেছি এবং সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করেছি। কথা না শুনলে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে।’
