ঢাকা শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬

মাছের সংকটে থমকে আছে শত মানুষের জীবন-জীবিকা

মাছের সংকটে থমকে আছে শত মানুষের জীবন-জীবিকা
×

নওগাঁর আত্রাই উপজেলার রেলস্টেশনের পাশে ভর তেঁতুলিয়া গ্রামে চাতালে মাছ শুকাচ্ছেন শ্রমিক সমকাল

নওগাঁ প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:৪৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

রেললাইনের ধারে নওগাঁর আত্রাই উপজেলার ভর তেঁতুলিয়া গ্রামে প্রবেশ করলেই নাকে ভেসে আসত শুঁটকির চেনা গন্ধ। সূর্যের আলোয় ঝকঝক করত মাছ শুকানোর চাতাল। ব্যস্ত হাতে কর্মরতদের মাছ উল্টে দেওয়া, দূরে স্তূপ করে রাখা শুঁটকি। এসব শুঁটকি যায় দেশের নানা প্রান্তে। এ বছর সেই চেনা দৃশ্য নেই। চাতাল অনেকটাই ফাঁকা, মানুষের মুখাবয়বে চাপা দুশ্চিন্তা।

উত্তরের মৎস্যসমৃদ্ধ জেলা নওগাঁর আত্রাই উপজেলায় দেশীয় মাছের সংকট দেখা দিয়েছে। নদী ও জলাশয়ে পানি কম থাকায় মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। এর ফলে এ এলাকার জন্য ঐতিহ্যবাহী শুঁটকি উৎপাদন কমে গেছে। এতে শুঁটকি ব্যবসায়ী ও শ্রমিকরা দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।

আত্রাই উপজেলা নদী ও জলাশয়নির্ভর এলাকা। এখানে পুঁটি, খলিশা, টাকি, শোল, চান্দা ও চোপড়া মাছ দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে শুঁটকি তৈরি হয়ে আসছে। এই শুঁটকি দেশের বিভিন্ন জেলা ছাড়াও ভারতে রপ্তানি হয়। 
আত্রাইয়ের পাশাপাশি মান্দা উপজেলার কিছু এলাকায়ও শুঁটকি উৎপাদন হয়। সেগুলোও যায় দেশের বিভিন্ন জেলায়।

এবারের বর্ষা মৌসুমে নদীতে পানি কম থাকায় মাছের প্রজনন ঠিকভাবে হয়নি। ফলে মাছের সরবরাহ কমে গেছে। চাহিদার তুলনায় মাছ কম পাওয়ায় পুঁটি, খলিশা ও টাকি মাছ কেজিপ্রতি ৪০ থেকে ৫০ টাকা বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। 
এতে শুঁটকি তৈরির খরচ বেড়েছে এবং অনেক চাতাল খালি পড়ে আছে।

আত্রাই উপজেলার ভর তেঁতুলিয়া গ্রাম শুঁটকির গ্রাম হিসেবে পরিচিত। রেলস্টেশনের দুই পাশে শুঁটকি শুকানোর চাতাল চোখে পড়ে। এখানকার ব্যবসায়ীরা জানান, শুঁটকি বিক্রিই তাদের প্রধান জীবিকা। এ বছর মাছের অভাবে উৎপাদন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, নওগাঁর শুঁটকি সৈয়দপুর, রংপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট, জামালপুর ও ঢাকায় পাঠানো হয়। পরে সৈয়দপুর থেকে ট্রেনে করে ভারতের ত্রিপুরায় রপ্তানি করা হয়।
আত্রাই উপজেলার আহসানগঞ্জ মৎস্য আড়ত জেলার প্রধান মাছের বাজার। এখান থেকেই কাঁচা মাছ কিনে শুঁটকি তৈরি করা হয়। বর্তমানে খলিশা মাছ কেজি ৭৫-৮০ টাকা, পুঁটি ১০০-১৬৫ টাকা এবং টাকি ২০০-২২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। শোল ও বোয়াল মাছ না পাওয়ায় উৎপাদন আরও কমে গেছে। ব্যবসায় মন্দা যাচ্ছে জানিয়েছেন সংশ্লিস্টরা।

ভর তেঁতুলিয়া গ্রামের শুঁটকি ব্যবসায়ী রকিবুল হাসান সমকাল প্রতিবেদককে বলেন, গত বছর এক মৌসুমে তিনি প্রায় ২৫ লাখ টাকার শুঁটকি বিক্রি করেছিলেন। এ বছর এখন পর্যন্ত মাত্র পাঁচ লাখ টাকার শুঁটকি তৈরি করতে পেরেছেন। মাছের দাম বেশি হওয়ায় লাভও কমে গেছে।
সিংগা গ্রামের ব্যবসায়ী আজহার আলী জানান, তিন মণ পুঁটি মাছ শুকিয়ে এক মণ শুঁটকি হয়, যার দাম ১০-১২ হাজার টাকা। চার মণ খলিশা মাছ থেকে এক মণ শুঁটকি পাওয়া যায়; যার দাম প্রায় ১০ হাজার টাকা।

অন্য ব্যবসায়ী সাদেক মোল্লা বলেন, বিল ও জলাশয় শুকিয়ে যাওয়ায় মাছ কমে যাচ্ছে। এ ছাড়া চায়না জাল দিয়ে অবাধে মাছ ধরায় মাছের প্রজনন নষ্ট হচ্ছে। তিনি অবৈধ জাল বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
এ বিষয়ে আত্রাই উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. মাকসুদুর রহমান বলেন, শুঁটকি ব্যবসায়ীদের নিরাপদ ও মানসম্মত শুঁটকি তৈরির প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। অবৈধ মাছ শিকার বন্ধে অভিযানও চলছে।
নওগাঁ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ফেরদৌস আলী জানান, আত্রাই ও মান্দা উপজেলায় প্রায় ৪০০ মানুষ সরাসরি ও পরোক্ষভাবে শুঁটকি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। পানি কম থাকলেও চলতি বছর জেলায় প্রায় ২৫০ টন শুঁটকি উৎপাদন হবে বলে আশা করা হচ্ছে; যার বাজার দর পাঁচ থেকে ছয় কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দেশীয় মাছের প্রজনন বাড়ানো, অবৈধ জাল বন্ধ এবং শুঁটকির মান উন্নয়নে দ্রুত সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। 

 

আরও পড়ুন

×