ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

শ্যামনগরে উপকূল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ

বাঁধের গোড়া থেকে মাটি তুলে ওপরে দেওয়ার অভিযোগ

নরম ও কর্দমাক্ত মাটির ওপর ব্লক স্থাপন

বাঁধের গোড়া থেকে মাটি তুলে ওপরে দেওয়ার অভিযোগ
×

শ্যামনগরে উপকূল রক্ষা বাঁধের গোড়া থেকে মাটি কেটে উঁচু করা হচ্ছে বাঁধ। উপজেলার গাবুরা দৃষ্টিনন্দন এলাকায় সমকাল

শ্যামনগর (সাতক্ষীরা) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:৩৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

শ্যামনগরে টেকসই উপকূল রক্ষা বাঁধ নির্মাণের অংশ হিসেবে ১৫ নম্বর পোল্ডারে চলমান প্রকল্পে বড় ধরনের অনিয়ম চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কাজে দীর্ঘসূত্রতার পাশাপাশি কার্যাদেশ অনুযায়ী উচ্চতা বজায় রাখতে বাঁধের গোড়ায় গর্ত করে মাটি তোলা হচ্ছে। এ ছাড়া নরম ও কর্দমাক্ত মাটির ওপর ব্লক স্থাপনসহ ব্লকের নিচে মানহীন ইটের খোয়া ব্যবহারের অভিযোগ তুলেছেন এলাকাবাসী। স্থানীয় জনগোষ্ঠী বা জনপ্রতিনিধিকে ডাম্পিং কার্যক্রমে সম্পৃক্ত না করার সুযোগ কাজে লাগিয়ে কর্তৃপক্ষ নদীতে বস্তা ও ব্লক কম ব্যবহার করছে।

পাউবো কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, স্থানীয়দের আপত্তির পর মানহীন খোয়া ব্যবহার না করতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সতর্ক করা হয়েছে।

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সর্বশেষ জনপদ দুর্যোগকবলিত গাবুরা ইউনিয়ন ঘিরে ২০২২ সালে এক হাজার ২০ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প গৃহীত হয়। এর আওতায় সুন্দরবন ও বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী দ্বীপ ইউনিয়নটির চারপাশে নতুনভাবে উঁচু করে টেকসই বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদিত হয়। ৫০টি প্যাকেজে ভাগ করে পুরো গাবুরাকে ঘিরে ২৯.৫ কিলোমিটার উপকূল রক্ষা বাঁধ নির্মাণের সেই কাজ শুরু হয় ২০২৩ সালে। নেশনটেক, আমির ইঞ্জিনিয়ারিং এবং আল মামুন এন্টারপ্রাইজসহ ১৫ জন ঠিকাদার কাজ পেয়েছেন। প্যাকেজগুলোর আওতায় মাটির কাজসহ জিও ব্যাগ এবং ব্লক প্লেসিংয়ের কাজ অন্তর্ভুক্ত। 
স্থানীয়দের অভিযোগ, ২৭ নম্বর প্যাকেজে নরম মাটির ওপরে ব্লক স্থাপন করা হচ্ছে। মানহীন খোয়া ব্যবহার হচ্ছে ১৯ ও ২৭ নম্বর প্যাকেজে।

এবাদুল গাজী ও মহিউদ্দীনসহ কয়েকজনের অভিযোগ, তিন বছর হতে চললেও ৫২টি প্যাকেজের মধ্যে মাত্র সাত থেকে আটটি পয়েন্টে মাটির কাজ শেষ হয়েছে। চার-পাঁচটি অংশে ব্লক স্থাপনের কাজ চলছে। সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা হরিশখালী, ডুমুরিয়াসহ অনেক পয়েন্টে বাঁধের বাইরের অংশে (নদীতে) জিও ব্যাগ ডাম্পিংয়ের কাজ এখনও শুরু হয়নি। বাঁধের নরম মাটির ওপর ব্লক স্থাপন ছাড়াও ম্যাপ অনুযায়ী নির্মাণ না করে উচ্চতা বজায় রাখার কৌশল হিসেবে কোনো কোনো অংশে বাঁধ জনবসতির দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।

গাবুরা ইউনিয়নের ৯ নম্বর সোরা গ্রামের বাসিন্দা ও ইয়ুথ ফর সুন্দরবনের সভাপতি আশিকুর রহমানের ভাষ্য, চলমান প্রকল্পের ২৭ ও ১৯ নম্বর প্যাকেজে ব্লক প্লেসিংয়ের ক্ষেত্রে মানহীন খোয়া ব্যবহার হচ্ছে। কিছু অংশে কাজ শেষে বিষয়টি স্থানীয়রা বুঝতে পেরে আপত্তি তোলায় উপসহকারী প্রকৌশলী সফিকুল ইসলাম ঘটনাস্থলে গিয়ে সেই খোয়া পরিবর্তনের আশ্বাস দেন।
গাবুরা দৃষ্টিনন্দন এলাকার জুনাইদ হোসেন অভিযোগ করেন, ব্লকের নিচে চার ইঞ্চির পরিবর্তে কোনো কোনো স্থানে খোয়া দেওয়া হয়েছে সর্বোচ্চ দুই থেকে আড়াই ইঞ্চি। ফলে অল্পদিনের মধ্যে পানি ঢুকে ব্লকগুলো স্থানচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

উচ্চতা বজায় রাখতে বাঁধের গোড়ায় গর্ত করে মাটি তোলা হচ্ছে অভিযোগ করে জুনাইদ হোসেন জানান, কোনো কোনো স্থানে চার-পাঁচ ফুট এমনকি, সাত ফুট পর্যন্ত গর্ত করে মাটি তোলা হচ্ছে। 
আবু হানজালা, জহুর আলী ও মশিউর রহমানসহ কয়েকজন গ্রামবাসীর অভিযোগ, ব্লক বসানোর আগে বাঁধের মাটি শুকানোর কথা। বাঁধে মাটির দেওয়ার পর রোলার দিয়ে সমান করার পর ব্লক স্থাপনের নির্দেশনা রয়েছে। অথচ তা না করে বালু ছিটিয়ে সমান করছে। অনেক স্থানে নরম মাটির ওপর জিও শিট দেওয়ার পর ব্লক স্থাপন করেছে।

গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জি এম মাসুদুল আলম জানান, উপজেলা পরিষদের সভায় বার বার বলেও ডাম্পিংকৃত বস্তা ও ব্লক গণনার কাজে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করতে পারেননি। পানির মধ্যে নির্দিষ্ট পরিমাণ ব্লক ও বস্তা ডাম্পিং হচ্ছে কিনা– সেটি নিয়ে স্থানীয়দের মতো তারও সংশয় রয়েছে। ২ নম্বর ওয়ার্ডে নিম্নমানের খোয়া ব্যবহারের পাশাপাশি ডুমুরিয়া এলাকায় নরম মাটির ওপর ব্লক বসানোর অভিযোগ করেন তিনি।

৪৩, ৪৪ নম্বর প্যাকেজে এখনও কাজ শুরু হয়নি। এ প্যাকেজের দায়িত্বে থাকা উপসহকারী প্রকৌশলী প্রিন্স রেজা জানান, বাঁধের নির্ধারিত স্থানে কিছু বাড়িঘর রয়েছে। কাজের দায়িত্ব ইউনুস অ্যান্ড ব্রাদার্স পেয়েছিল, কিন্তু তাদের থেকে কাজ নিয়েছে রহমান অ্যান্ড ব্রাদার্স। এখনও জায়গা বের করে দিতে না পারায় কাজ শুরু করা যায়নি।

প্রজেক্ট ম্যানেজারের দায়িত্বে থাকা সেলিম হোসেন জানান, গাইডওয়ালের মাটি ওপরে উঠিয়ে রাখার কারণে স্থানীয়রা ভুল বুঝে বাঁধের গোড়ায় গর্ত করার অভিযোগ তুলছেন। এসব মাটি শুকানোর আগেই স্থানীয়রা নিয়ে যাচ্ছে– অভিযোগ করে তিনি বলেন, চেইন ড্রেজার দিয়ে কম্প্যাক করায় নরম মাটির ওপর ব্লক স্থাপনের অভিযোগ ভিত্তিহীন।

সংশ্লিষ্ট প্যাকেজের দায়িত্বে থাকা উপসহকারী প্রকৌশলী মো. সফিকুল ইসলাম জানান, নিম্নমানের খোয়া ব্যবহারের অভিযোগ পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে গিয়ে তা পরিবর্তনের নির্দেশ দিয়েছেন। কার্যাদেশ অনুযায়ী বাঁধের উচ্চতা ৫.৫ মিটার (আরএল) হচ্ছে নিশ্চিত করে তিনি আরও বলেন, তাঁর অধীনে মাত্র তিন-চারটি প্যাকেজ রয়েছে। তাই অন্য প্যাকেজের কাজ নিয়ে তিনি কিছু বলতে পারবেন না।
অন্য প্যাকেজের দায়িত্বে থাকা উপসহকারী প্রকৌশলী মাসুদ রানা জানান, দুই দফা সময় বাড়ানোর পর এখনও ১৯ মাসের মতো সময় রয়েছে। কোনো কারণে ঠিকাদার কার্যাদেশ অনুযায়ী কাজ না করলে তাঁর বিল ছাড় করা হবে না।

পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী আশরাফুল আলম জানান, প্রায় ৫৩ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। চিংড়ি চাষের এলাকা হওয়ায় অনেক অংশে পানি থাকায় মাটি নেওয়া যায়নি। ঘের ও জলাধারগুলো শুকিয়ে মৌসুম শুরু হওয়াতে দ্রুত মাটির কাজ শুরু হবে। আগামী বছরে সেসব অংশে ব্লকের কাজ শুরু হবে। তিনি আরও বলেন, বাঁধের গোড়ার মাটি কেটে ওপরে দেওয়ার সুযাগ নেই। গোড়া থেকে মাটি কেটে থাকলে আবার সেই যথাস্থানে মাটি ফেলে স্ল্যাব তৈরিসহ পরিমাপ করা হবে।
 

আরও পড়ুন

×