রাজশাহীর চারঘাট
ক্ষেতের সার মাছচাষির পুকুরে
পুকুরে অ্যামোনিয়া নিয়ন্ত্রণে লাগে টিএসপি সার, নেই বরাদ্দ
চারঘাটের সালিয়ারদহ পুকুরে সম্প্রতি সার ছিটাচ্ছেন এক মাছচাষি সমকাল
সনি আজাদ, চারঘাট (রাজশাহী)
প্রকাশ: ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৮:৫১ | আপডেট: ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১০:২৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
রাজশাহীর চারঘাটে কৃষি ও মৎস্য খাতে সারের ব্যবহার নিয়ে সংকট দেখা দিয়েছে। কৃষিজমির জন্য বরাদ্দ সার বেশি দামে কিনে ব্যবহার করছেন মাছচাষিরা। এতে কৃষকরা সময়মতো সার পাচ্ছেন না; অন্যদিকে মাছ চাষের খরচও বেড়ে যাচ্ছে। মাঝখানে সিন্ডিকেট করে ফায়দা লুটছে একদল অসাধু ডিলার।
বরাদ্দ কম, বেশি দামে ‘পাচার’ পুকুরে
উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, চারঘাটে ১৩ হাজার ৩০০ হেক্টর ফসলি জমির বিপরীতে বছরে টিএসপি সারের বরাদ্দ মাত্র এক হাজার ৫০ টন। চলতি বছরে বরাদ্দ পাওয়া সারের পরিমাণ হলো–টিএসপি এক হাজার ৫০ টন, ডিএপি তিন হাজার ৪৮৬ টন, পটাশ এক হাজার ৮১৫ টন, ইউরিয়া চার হাজার ৪৮০ টন। ইউনিয়ন ও পৌরসভার ডিলারের মাধ্যমে কৃষকদের কাছে এসব বিক্রি করা হয়।
এদিকে মৎস্য অফিসের হিসাবে, উপজেলার এক হাজার ১০০ হেক্টর জলাশয়ের তিন হাজার ৬০৭টি পুকুরে বছরে শুধু টিএসপি প্রয়োজন হয় প্রায় ৬৪৯ টন। অর্থাৎ মোট বরাদ্দের অর্ধেকেরও বেশি প্রয়োজন হয় মাছ চাষে; যার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে আলাদা কোনো বরাদ্দ নেই।
এ সুযোগটিই নিচ্ছেন ডিলাররা। সাধারণ কৃষকদের ‘সার নেই’ বলে ফিরিয়ে দিলেও অগ্রিম টাকা নিয়ে মাছচাষিদের কাছে বেশি দামে সার বিক্রি করছেন। যেমনটি ঘটেছে পৌরসভার পিন্টু আলীর সঙ্গে। ডিলার তাঁকে লোক নেই বলে ফিরিয়ে দিলেও অন্য পথে সার বিক্রি ঠিকই সচল রেখেছেন।
কৃষক-মাছচাষিদের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
সরেজমিনে চারঘাট সদর ও নিমপাড়া ইউনিয়ন ঘুরে দেখা যায়, পেঁয়াজ, রসুন ও পেয়ারা বাগান পরিচর্যার জন্য টিএসপি সারের তীব্র সংকট। পাইটখালি এলাকার কৃষক রায়হান আলী আক্ষেপ করে বলেন, ‘তিন-চারজন ডিলারের কাছে ঘুরেও সার পাইনি। অথচ মাছচাষিরা অগ্রিম টাকা দিয়ে ঠিকই সার নিয়ে যাচ্ছেন। এক হাজার ৩৫০ টাকার সার আমাদের দুই হাজার ২০০ টাকা দিয়ে কিনতে হচ্ছে।’
শলুয়া ইউনিয়নের মাছচাষি সাত্তার হোসেন জানান, সঠিক সময়ে সার দিতে না পারায় তাঁর কয়েক লাখ টাকার মাছ মারা গেছে। বাধ্য হয়ে আগেভাগে সার মজুত করতে হচ্ছে। মাছচাষিরা বলছেন, তারাও দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন, কিন্তু বরাদ্দ না থাকায় তাদের ‘চোর’ হিসেবে গণ্য হতে হচ্ছে।
ডিলারদের সিন্ডিকেট ও প্রশাসনের তৎপরতা
অভিযোগ রয়েছে, কিছু ডিলার সিন্ডিকেট করে সারের বড় চালান চারঘাটের বাইরেও পাচার করছেন। মাছচাষিদের সঙ্গে সিন্ডিকেট করে কৃষিজমির সার গোপনে বিভিন্ন এলাকায় পাঠাচ্ছেন। মাঝেমধ্যে কিছু বড় চালান ধরা পড়লেও বেশির ভাগ সময় এসব সার উপজেলা ও ইউনিয়নের বাইরে চলে যাচ্ছে।
গত ২৩ অক্টোবর ভায়ালক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের ডিলার জাহাঙ্গীর হোসেনের ৪০ বস্তা এবং এর আগে ডিলার আসগর আলীর ৫০ বস্তা পাচার হওয়া সার আটক করে কৃষি বিভাগ ও প্রশাসন।
২৫ অক্টোবর সকালে চারঘাট সদর ইউনিয়নের মুংলি এলাকায় একটি ভ্যানে ১০ বস্তা টিএসপি ও ইউরিয়া সার নিয়ে যেতে দেখা যায়। ভ্যানচালক জানান, পৌরসভার এক ডিলারের কাছ থেকে সার নিয়ে তিনি এক মাছচাষির কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন।
উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘পুকুরে অ্যামোনিয়া নিয়ন্ত্রণে টিএসপি সার অপরিহার্য। আমরা প্রতিবছর সারের চাহিদা পাঠালেও মৎস্য খাতের জন্য কোনো বরাদ্দ আসে না। ফলে চাষিরা কৃষি খাতের সারের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছেন।’
চারঘাট উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আল মামুন হাসান জানান, ‘কৃষকের চাহিদা অনুযায়ীই সার আসে। সেখানে মাছ চাষের কোনো অংশ নেই। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এই সার বাইরে পাচারের চেষ্টা করছেন। আমরা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি, জরিমানা করছি এবং কৃষকরা যাতে সার পান সে বিষয়ে মাঠ পর্যায়ে কাজ করছি।’
