স্বপ্ন তাদের পরিচ্ছন্ন দেশ গড়ার
রাস্তার পাশে পড়ে থাকা আবর্জনা পরিষ্কার করছেন ক্লিন আপ ভালুকার সদস্যরা সমকাল
ভালুকা (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৮:২২ | আপডেট: ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১২:৫৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
চলার পথে প্লাস্টিকের বোতল, ড্রেনে জমে থাকা ময়লা কিংবা যত্রতত্র ছড়িয়ে থাকা আবর্জনা যেন দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে গেছে। বিষয়টি স্বাভাবিক মনে হয়নি কিছু তরুণ-তরুণীর কাছে, তাদের কাছে এমন নোংরা দৃশ্য রীতিমতো অস্বাভাবিক ও অস্বস্তিকর। ফলে রুটিন করে সপ্তাহে অন্তত এক দিন নিজেরাই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরু করেন। সেই সঙ্গে রাস্তার পাশে ময়লা-আবর্জনা না ফেলে নির্দিষ্ট স্থানে বা ডাস্টবিনে ফেলার পরামর্শ দিয়ে মানুষকে সচেতন করতে থাকেন।
জানা গেছে, ভালুকা উপজেলা পরিচ্ছন্ন রাখার দাবি নিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও দপ্তরে ঘুরে ঘুরে হয়রান হয়ে কয়েকজন তরুণ-তরুণী উপলব্ধি করেন এভাবে হবে না। নিজেদেরই উদ্যোগী হয়ে পরিচ্ছন্নতার কাজে নামতে হবে। এই ভাবনা থেকে স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শতাধিক তরুণ-তরুণী ২০১৯ সালে গড়ে তোলে ‘ক্লিন আপ ভালুকা’ নামে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। এর পর থেকে তারা নিজেরাই রুটিন করে সপ্তাহে অন্তত দু-এক দিন পরিচ্ছন্নতার কাজ শুরু করেন। সেই থেকে ধারাবাহিকভাবে পরিচ্ছন্ন কার্যক্রম চালিয়ে আসছেন তারা। চাকরি বা অন্য কোনো কারণে সংগঠন থেকে কেউ চলে গেলে আবার নতুনরা যুক্ত হচ্ছেন। কিন্তু তাদের কাজ কখনও থামেনি। পরিচ্ছন্ন ভালুকা গড়তে অঙ্গীকারবদ্ধ তারা।
প্রথম দিকে মোটেও সহজ ছিল না এই কাজ। শুরুর দিকে একই ধরনের টি শার্ট, হাতে গ্লাভস পরে পরিচ্ছন্নতা অভিযানে নেমে পড়লে বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতেন পথচারীরা। উৎসুক জনতা এসব দেখার জন্য ভিড় জমাতেন। অনেকে বলতেন, কারা এই শিক্ষার্থীদের এমন নোংরা কাজ করাচ্ছে। আবার কেউ কেউ দেখেন ওই ছেলেটা বা মেয়েটা তাঁর পরিচিত বা আত্মীয় কিংবা প্রতিবেশী। তারা এই কাজ করছে কেন, এমন নানা প্রশ্নের মাঝে পড়তে হতো। কেউ কেউ হাসতেনও। কিন্তু কাজ থেমে থাকেনি। ধীরে ধীরে উদ্যোগটি বড় আকার নেয়। সংগঠনের সদস্যরা নিয়মিত রাস্তা, খাল, ড্রেন, পার্ক ও জনসমাগমস্থল পরিষ্কার করেন। শুধু পরিষ্কার করাই নয়, মানুষকে বোঝান আবর্জনা নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলার ব্যাপারে। স্কুল-কলেজে আয়োজন করেন সচেতনতামূলক কর্মসূচি। ছোটদের মনে পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস গড়ে তোলা তাদের অন্যতম লক্ষ্য।
ক্লিন আপ ভালুকার কো-অর্ডিনেটর সাখাওয়াত হোসেন সুমনের ভাষ্য, এই সংগঠনের প্রত্যেক সদস্য স্বপ্ন দেখেন একটি পরিচ্ছন্ন ভালুকা, পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশের। পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ গড়তে হলে প্রথমেই মানসিকতার পরিবর্তন দরকার। ক্লিন আপ ভালুকা সে লক্ষ্যেই কাজ করে চলেছে। তিনি বলেন, শুধু সরকারের উদ্যোগ দিয়ে পরিচ্ছন্ন শহর গড়া সম্ভব নয়। জনগণকে যুক্ত না করলে টেকসই সমাধান আসে না। তাই তাদের অন্যতম লক্ষ্য সাধারণ মানুষকে সরাসরি সম্পৃক্ত করা ও যেখানে-সেখানে আবর্জনা ফেলা বন্ধ করা। নির্দিষ্ট স্থান ময়লা-আবর্জনা ফেলার অভ্যাস গড়ে তোলা।
তরুণদের এই উদ্যোগ অনেকটাই সফল, তাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছে বহু স্বেচ্ছাসেবী, কাজের পরিধিও বেড়েছে। উপজেলা ও পৌর প্রশাসন তাদের নিয়ে অনেক কাজের পরিকল্পনা করছে, সম্পৃক্ত করছে এসব স্বেচ্ছাসেবীদের।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ভালুকা আঞ্চলিক কমিটির সদস্য সচিব কামরুল হাসান পাঠান কামাল জানান, ক্লিন আপ ভালুকার স্বেচ্ছাসেবীদের এই উদ্যোগ ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। এটি এখন একটি সামাজিক আন্দোলনে রূপ নিয়েছে।
ভালুকা পৌরসভার প্রশাসক ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) ইকবাল হোসাইন বলেন, তরুণ-তরুণীদের এই স্বপ্ন আরও বড় হতে পারে। হয়তো এক দিন সত্যিই আমরা দেখতে পাব রাস্তার ধারে আর কোনো পলিথিন উড়ে বেড়াচ্ছে না, খাল-ড্রেন ভরে নেই আবর্জনায়।
গত এপ্রিলে ‘গ্রিন অ্যান্ড ক্লিন ভালুকা’ নামে একটি প্রকল্প গ্রহণ করেন সদ্য বিদায়ী ভালুকা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাসান আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ। তিনি বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও সুধীজন সম্পৃক্তকে করে প্রকল্পটির ৭০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন করেন। তিনি বলেন, এই তরুণ-তরুণীরা পরিবর্তনের ভিত্তি গড়ে দিয়েছেন, এখন শুধু ধারাবাহিকতা প্রয়োজন।
