ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সংসদ নির্বাচন ২০২৬: কিশোরগঞ্জ

ফাঁকা মাঠে চাপে ফজলুর রহমান, সুবিধা নিতে তৎপর অন্যরা

জেলার বেশির ভাগ আসনে বিএনপিতে প্রার্থিতা নিয়ে বিরোধ

ফাঁকা মাঠে চাপে ফজলুর রহমান, সুবিধা নিতে তৎপর অন্যরা
×

ফজলুর রহমান, শেখ রোকন রেজা, কাজী রেহা কবির সিগমা

মোস্তফা কামাল, কিশোরগঞ্জ

প্রকাশ: ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৮:৪৬ | আপডেট: ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১২:১৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

তিনটি হাওর উপজেলা ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম নিয়ে কিশোরগঞ্জ-৪ আসন। এই এলাকায় বিএনপি ও আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) ছাড়া অন্য দলগুলো সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী নয়। এখানে বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী। তবে নির্বাচনে প্রায় ফাঁকা মাঠ পেয়েও দলের ভেতর থেকে বিরোধিতাসহ নানা কারণে তিনি চাপে পড়েছেন। এর সুবিধা নিতে তৎপর অন্য সম্ভাব্য প্রার্থীরা।

ফজলুর রহমানের বাড়ি ইটনা। সম্প্রতি তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জোরালো বক্তব্য দিয়ে দেশব্যাপী বেশ আলোচিত হয়েছেন। এই আসনে সাতবার নির্বাচিত হয়েছেন আবদুল হামিদ। তিনি রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এমপি ছিলেন রেজওয়ান আহাম্মদ তৌফিক।

ফজলুর রহমান দুইবার মোঃ আবদুল হামিদের বিরুদ্ধে নির্বাচন করে বেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুললেও পাস করতে পারেননি। তিনি ২০১৮ সালে তৌফিকের বিরুদ্ধে বিএনপির মনোনয়নে প্রার্থী হন। তবে মাঝপথে নির্বাচন বর্জন করেন। এবার আওয়ামী লীগ মাঠে নেই। দলের নেতাকর্মীদের অনেকে এলাকাছাড়া। প্রায় ফাঁকা মাঠেও ফজলুর রহমানের চাপে পড়ার একটি কারণ, গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা-হামলা। এ কারণে পুরোনো বৈরিতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আওয়ামী লীগের ভোটারদের নতুন ক্ষোভ।

ফজলুর রহমান ছাড়া নির্বাচনে প্রচার চালাচ্ছেন জামায়াতে ইসলামীর সম্ভাব্য প্রার্থী জেলা ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট শেখ রোকন রেজা, স্বতন্ত্র প্রার্থী কাজী রেহা কবির সিগমা এবং ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন ও খেলাফত মজলিসের সম্ভাব্য প্রার্থীরা। সিগমা ব্যবসায়ী। সম্প্রতি তিনি ঢাকা থেকে এলাকায় গিয়ে জনসংযোগ শুরু করেছেন।

এর আগে উপজেলা নির্বাচনসহ কিছু ঘটনায় ফজলুর রহমান বিএনপির কয়েকজন প্রভাবশালী নেতাকে বৈরী করে ফেলেছেন বলে দলেই আলোচনা হচ্ছে। এ আসনে একটা সময় পর্যন্ত বিএনপিতে ফজলুর রহমানের কোনো বিকল্প নেই ভাবা হলেও অন্তত অর্ধডজন মনোনয়নপ্রত্যাশী মাঠে নেমেছেন। তাদের কেউ কেউ এখনও ফজলুর রহমানের বিরোধিতা করে যাচ্ছেন। হাওর এলাকায় আওয়ামী লীগের অনেক ভোট আছে। তাদের অনেকে ফজলুর রহমানের বিরোধী। এসব ভোট নির্বাচনে নিয়ামক ভূমিকা রাখবে বলে বিএনপির অনেক নেতাকর্মী মনে করেন।

কিশোরগঞ্জ-৪ আসনে মোট ভোটার চার লাখ তিন হাজার ৩৮০। হিন্দু ভোটার প্রায় ১২ শতাংশ। এর মধ্যে অষ্টগ্রামেই বেশি। তাদের ভোটও জয়-পরাজয়ে বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে।

এই আসন থেকে বিএনপির মনোনয়ন চেয়েছিলেন সাবেক হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ট্রাস্টি সুরঞ্জন ঘোষ। তিনি বলেন, তাঁকে মনোনয়ন দিলে হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোট তাঁর পক্ষেই আসত। তিনি মনে করেন, গণঅভ্যুত্থানের পর যেসব মামলা হয়েছে, সেগুলো বিএনপির লোকেরা করেছেন। মামলা বাণিজ্যও করেছেন। এসব কারণে আওয়ামী লীগের এবং তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল ভোটারদের মধ্যে বিএনপির প্রতি একটা ক্ষোভ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। 

স্বতন্ত্র প্রার্থী রেহা কবির সিগমা বলেন, ‘অষ্টগ্রামে ১২ শতাংশ হিন্দু ভোটার আছেন। তাদের প্রতি আমার যেমন সহানুভূতি আছে, তাদেরও আমার প্রতি সহানুভূতি দেখেছি। নারীদের মাঝেও ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। তবে আওয়ামী লীগের ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে যাবেন কিনা বলা যাচ্ছে না।’ 

কিশোরগঞ্জ-১
কিশোরগঞ্জ-১ (সদর-হোসেনপুর) আসনে সম্ভাব্য প্রার্থী জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম, জেলা জামায়াতের সাবেক নায়েবে আমির অধ্যাপক মোসাদ্দেক ভূঁইয়া, গণঅধিকার পরিষদের উচ্চতর পরিষদ সদস্য আবু হানিফ, সিপিবির জেলা কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এনামুল হক, বাসদের (মার্ক্সবাদী) আলাল মিয়া, ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের অধ্যাপক আজিজুর রহমান, খেলাফত মজলিসের হেদায়েতুল্লাহ হাদী ও জমিয়তে ইসলামীর জেলা কমিটির সভাপতি মাওলানা মাহমুদুল্লাহ জামী। এ আসনে বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে কোন্দল তীব্র। জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি ২০১৮ সালে মনোনয়নপ্রাপ্ত রেজাউল করিম খান চুন্নু ও সাবেক এমপি মাসুদ হিলালীসহ চারজন মনোনয়নপ্রত্যাশী একজোট হয়ে মনোনয়ন পরিবর্তনের আন্দোলন করছেন।

কিশোরগঞ্জ-২
কিশোরগঞ্জ-২ (পাকুন্দিয়া-কটিয়াদী) আসনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী পিপি অ্যাডভোকেট জালাল উদ্দিন। জামায়াতের সম্ভাব্য প্রার্থী কটিয়াদী উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম মোড়ল। এ ছাড়া সিপিবির জেলা কমিটির সভাপতি আব্দুর রহমান, এনসিপির কেন্দ্রীয় সংগঠক আবু সাঈদ উজ্জ্বল ও গণঅধিকার পরিষদের জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম প্রার্থী হিসেবে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। এখানে বিএনপির সাবেক এমপি মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান জামায়াতে যোগ দেওয়ায় দলটি বেশ আশাবাদী।

কিশোরগঞ্জ-৩
কিশোরগঞ্জ-৩ (করিমগঞ্জ-তাড়াইল) আসনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ড. ওসমান ফারুক। জামায়াতের সম্ভাব্য প্রার্থী কেন্দ্রীয় মজলিশে শূরা সদস্য ডা. জেহাদ খান। তিনি সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের শ্যালক। এখানে সিপিবি জেলা কমিটির সাবেক সভাপতি ডা. এনামুল হক ইদ্রিছ, জেলা এনসিপির আহবায়ক শেখ খায়রুল কবির, ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের জেলা কমিটির সভাপতি আলমগীর হোসাইন ও করিমগঞ্জ উপজেলা গণতন্ত্রী পার্টির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন ভূঁইয়া প্রার্থী হিসেবে প্রচার চালাচ্ছেন। জেলা বিএনপির সহসভাপতি, ২০০৮ সালের নির্বাচনে দলের মনোনয়ন পাওয়া অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর আলম মোল্লা সম্প্রতি সংবাদ সম্মেলন করে ড. ওসমান ফারুককে বয়সের কারণে শারীরিকভাবে অক্ষম উল্লেখ করে নিজে মনোনয়ন দাবি করেছেন। এ আসনে জাপার সাবেক মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু সম্ভাব্য শক্তিশালী প্রার্থী হলেও তিনি একাধিক মামলার আসামি হওয়ায় ৫ আগস্টের পর এলাকায় আসেননি। 

কিশোরগঞ্জ-৫
কিশোরগঞ্জ-৫ (নিকলী-বাজিতপুর) আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী অ্যাডভোকেট সৈয়দ এহসানুল হুদা। আরও একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশী থাকলেও তারা এখন নীরব। এখানে জামায়াতের প্রার্থী জেলা কমিটির আমির অধ্যাপক মো. রমজান আলী। এছাড়াও রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি অ্যাডভোকেট হাসনাত কাইয়ুম সম্ভাব্য প্রার্থী। সৈয়দ এহসানুল হুদা ১২ দলীয় জোটের সমন্বয়ক ও বাংলাদেশ জাতীয় দলের চেয়ারম্যান ছিলেন। সম্প্রতি তিনি দল বিলুপ্ত করে বিএনপিতে যোগ দেন এবং মনোনয়ন নিশ্চিত করেন। বাজিতপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমান ইকবালকে এর আগে দল মনোনয়ন দিলেও পরে তা স্থগিত করে সৈয়দ এহসানুল হুদাকে দেয়।

কিশোরগঞ্জ-৬
কিশোরগঞ্জ-৬ (ভৈরব-কুলিয়ারচর) আসনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী জেলা বিএনপির সভাপতি ও কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শরীফুল আলম। দলে অন্য কেউ মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন না। এখানে জামায়াতের সম্ভাব্য প্রার্থী ভৈরব উপজেলা কমিটির আমির মাওলানা কবির হুসাইন। এ ছাড়া এনসিপির মোজাক্কির আজাদ সাব্বির, সিপিবি মোহাম্মদ হাবিল মিয়া, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মাওলানা আতাউল্লাহ আমিন, খেলাফত মজলিসের মাওলানা সাইফুল ইসলাম, জাকের পার্টির জেলা কমিটির সভাপতি আব্দুল হাকিম, ইসলামী আন্দোলন বাংলদেশের মোহাম্মদ মুসা খান সম্ভাব্য প্রার্থী। এখানে সাংগঠনিক শক্তিতে বিএনপি অন্য দলগুলোর চেয়ে এগিয়ে। এ আসনে বিভিন্ন সময়ে নির্বাচনে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান (প্রয়াত) ও তাঁর ছেলে নাজমুল হাসান পাপন বিজয়ী হন।

আরও পড়ুন

×