পরিবেশ ছাড়পত্র নেই জানে প্রশাসন, তবু চলছে ইটভাটা
কৃষি জমির পাশে গড়ে তোলা মেসার্স এমআইডি ব্রিকস। শুক্রবার সকালে ভেদরগঞ্জের কার্তিকপুর সেতুর পাশ থেকে তোলা সমকাল
ভেদরগঞ্জ (শরীয়তপুর) সংবাদদাতা
প্রকাশ: ০৪ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৮:১৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার একটি ইটভাটারও পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই। লাইসেন্সও নবায়ন করে না তারা। প্রশাসন সেটি জানে। এরপরও ভাটাগুলো নির্বিঘ্নে চলছে। প্রশাসন বলছে, লাইসেন্স নবায়ন না করা এবং পরিবেশ ছাড়পত্র না থাকা ইটভাটার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা ভূমি অফিস সূত্রে জানা গেছে, ভেদরগঞ্জ উপজেলায় ছয়টি ইটভাটা রয়েছে। সবগুলোই গড়ে উঠেছে নদী ও খাসজমি দখল করে। চলতি মৌসুম শুরুর পর দুই মাস ধরে এগুলোয় পুরোদমে ইট উৎপাদনের কাজ চলছে। উপজেলার জনবসতিপূর্ণ এলাকা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান-সংলগ্ন ও ফসলি জমিতে এসব ইটভাটা গড়ে উঠায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। তারা বলছেন, প্রশাসনের কাছে একাধিকবার অভিযোগ দিলেও এসব অবৈধ ইটভাটা বন্ধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এতে হুমকিতে পড়েছে উপজেলার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য।
রামভদ্রপুর ইউনিয়নের কার্তিকপুর চর হোগলা নদীর কার্তিকপুর সেতু-সংলগ্ন এলাকায় অবৈধভাবে নদী ভরাট করে গড়ে উঠেছে মেসার্স এমআইডি ব্রিকস নামের ইটভাটা। এটির ১০০ মিটারের মধ্যে আছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বন্দর বাজার ও জনবসতি।
একইভাবে নদীর জায়গা দখল করে রামভদ্রপুরে গড়ে উঠেছে বিসমিল্লাহ ও নিউ বিসমিল্লাহ নামে আরও দুটি ইটভাটা। নদীর জায়গা দখল ও পরিবেশ ছাড়পত্র না থাকায় গত বছর স্থানীয় প্রশাসন অভিযান চালিয়ে এ দুটিকে জরিমানা করেছিল। এ বছরও তাদের কার্যক্রম চলছে।
এ ছাড়া উপজেলার চরসেনসাস ইউনিয়নের নরসিংহপুর ফেরিঘাট এলাকায় মেসার্স মেঘলা ব্রিকস ও বেড়াচাক্কি এলাকায় মেসার্স আর বি এম ব্রিকস এবং নারায়ণপুর ইউনিয়নের নারায়ণপুর
বাজারের পাশে কৃষি ও সরকারি খাসজমি দখল করে মেসার্স এনবিএন ব্রিকস নামে ইটভাটা পরিচালনা করা হচ্ছে।
এসব ভাটায় কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে কৃষিজমির উপরিভাগের মাটি (টপ সয়েল)। এতে ফসলি জমির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে। একদিকে অবৈধভাবে পোড়ানো হচ্ছে ইট, অন্যদিকে কৃষিজমি থেকে মাটি যাচ্ছে ইট ভাটাগুলোতে। শিশুদের শ্রমিক হিসেবে কাজ করানো হচ্ছে।
নরসিংহপুর ফেরিঘাটের পাশে এক মাস ধরে কৃষিজমি থেকে অবৈধভাবে শতাধিক ডাম্প ট্রাকের মাধ্যমে কৃষিজমির টপ সয়েল কেটে বিক্রি করা হচ্ছে। প্রকাশ্যে এ কাজ চললেও নির্বিকার
উপজেলা প্রশাসন।
রামভদ্রপুর এলাকার স্থানীয় প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক আল আমিন বলেন, ইটভাটাটি স্কুল-সংলগ্ন হওয়ায় ভাটার কালো ধোঁয়া ও কালিতে কোমলমতি শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় বসবাসকারীরা ব্যাপক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে। শুনেছি, অবৈধভাবে ভাটাটি পরিচালনা করা হচ্ছে। ভাটার মাটি আনা-নেওয়ার ডাম্প ট্রাকগুলো স্কুলের সামনে দিয়ে দ্রুতগতিতে চলাচল করে। গত এক মাসে তিনটি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এরপরও প্রশাসন এটি বন্ধে কার্যকার কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। আমাদের দাবি, দ্রুত অবৈধ ইটভাটা ও ডাম্প ট্রাকগুলো বন্ধ করা হোক।
কার্তিকপুর এলাকার মেসার্স এমআইডি ব্রিকসের ম্যানেজার মনিরুজ্জামান বলেন, অন্যান্য ইটভাটা যেভাবে চালাচ্ছে, আমরাও সেভাবেই ভাটা চালাচ্ছি। এ উপজেলায় কোনো ইটভাটারই কাগজ নেই, আপনি যাচাই করে দেখেন। সবাই পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র পেলে আমরাও পাব।
এ বিষয়ে শরীয়তপুর জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক রাসেল নোমান বলেন, ভেদরগঞ্জ উপজেলার সবকটি ইটভাটা পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র না নিয়ে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এগুলোর ব্যাপারে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শরীয়তপুর জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগম বলেন, প্রতিটি ইটভাটাকে লাইসেন্স নবায়ন করাসহ পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছি। যারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লাইসেন্স নবায়ন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নিতে ব্যর্থ হয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ভেদরগঞ্জ উপজেলার অবৈধ ইটভাটাগুলো বন্ধে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ভেদরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাফিজুল হক বলেন, অবৈধ ইটভাটা চিহ্নিত করার কাজ চলছে। পরিবেশ ও জনস্বার্থ রক্ষায় নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে। অবৈধভাবে ফসলি জমি থেকে মাটি কাটলে কিংবা নদী ও খাল থেকে মাটি উত্তোলন করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে জরিমানা, ভাটা বন্ধসহ আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
- বিষয় :
- ইটভাটা
