ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

উন্নয়ন কাগজে, বাস্তবে স্থবিরতা

উন্নয়ন কাগজে, বাস্তবে স্থবিরতা
×

সামান্য বৃষ্টি হলেই বগুড়া শহরের সবুজবাগ এলাকার ভাঙা রাস্তাঘাট এভাবেই তলিয়ে যায় সমকাল

লিমন বাসার, উত্তরাঞ্চল

প্রকাশ: ১০ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৮:০৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

বগুড়াকে উত্তরবঙ্গের প্রাণকেন্দ্র বলা হলেও গত ১৭ বছরে উন্নয়নের সুফল পাননি সাধারণ মানুষ। সরকারি হিসাব মতে, ২০০৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত জেলায় উন্নয়ন খাতে খরচ হয়েছে প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা। হাজার হাজার কোটি টাকার এই ব্যয় কেবল কাগজ-কলম আর উদ্বোধনী ফলকেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। বাস্তবে টেকসই উন্নয়ন না হওয়ায় জনজীবন আজও স্থবির।

একনজরে কোথায় কত খরচ
সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে খরচের একটি চিত্র পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সড়ক ও যোগাযোগ: ৪,৫০০-৫,০০০ কোটি টাকা; পৌর অবকাঠামো (ড্রেন, ফুটপাত, লাইট): ৩,৫০০ কোটি টাকা; নদীভাঙন রোধ ও নদীশাসন: ৩,০০০ কোটি টাকা; শিক্ষা অবকাঠামো: ২,০০০ কোটি টাকা; স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন: ১,৫০০ কোটি টাকা; পানি ও স্যানিটেশন: ১,২০০ কোটি টাকা; অন্যান্য (আশ্রয়ণ, কৃষি ও খাল খনন): ১,০০০ কোটি টাকা।

কেন সুফল মিলছে না
অভিযোগ রয়েছে, নানা খাতে বরাদ্দ হলেও উন্নয়ন নামমাত্র। শহরের বনানী-মাটিডালি বা সাতমাথার মতো গুরুত্বপূর্ণ সড়কে গত এক দশকে একাধিকবার সংস্কার কাজ হয়েছে। নথি অনুযায়ী, অনেক রাস্তায় তিন বছরে দুবার কার্পেটিং করা হয়েছে। ঠিকাদারি বিল পরিশোধ হলেও নিম্নমানের কাজের কারণে এক বর্ষাতেই সড়কগুলো খানাখন্দে ভরে যায়। গ্রামীণ পর্যায়ে অনেক জায়গায় ব্রিজ থাকলেও সংযোগ সড়ক নেই, কোথাও রাস্তা থাকলেও ব্রিজ নেই।

জনপ্রতিনিধি আব্দুল কাদের বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ঠিকাদারি সিন্ডিকেট, লাইসেন্স ভাড়া দিয়ে কাজ বিক্রি এবং নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের প্রবণতা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্পের কাজ বাস্তবে করেন সাব-কন্ট্রাক্টররা, যাদের ওপর কার্যকর নজরদারি নেই। ফলে কাজের মান নিশ্চিত না করেই প্রকল্প সমাপ্ত দেখানো হয়।
পৌর এলাকায় ড্রেনেজ ব্যবস্থার জন্য শত শত কোটি টাকা খরচ হলেও সামান্য বৃষ্টিতেই শহর ডুবে যায়। পৌরসভার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলছেন, ড্রেন নির্মাণের সময় কোনো ‘আউটলেট’ বা পানি বের হওয়ার পথ রাখা হয়নি। অপরিকল্পিত কাজ আর দখলের জন্য এ অবস্থা বলছেন তিনি। ক্ষোভ প্রকাশ করে শহরের বাসিন্দা আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘প্রথম শ্রেণির কর দিয়েও নাগরিকরা তৃতীয় শ্রেণির সুবিধা পাচ্ছি।’

যমুনা ও বাঙালি নদীর তীর সংরক্ষণে ৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলেও প্রতি বছরই নতুন নতুন এলাকা নদীতে বিলীন হচ্ছে। জিওব্যাগ ও ব্লক বসানোর কাজ বর্ষার আগেই শেষ দেখিয়ে বিল তোলা হয়, যা পানির তোড়ে ভেসে যায়। ভুক্তভোগীদের মতে, এটি নদীশাসন নয়; বরং সরকারি বরাদ্দের হরিলুট।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে শত শত নতুন ভবন নির্মিত হয়েছে। তবে শিবগঞ্জের মতো অনেক উপজেলায় আধুনিক ভবন থাকলেও সেখানে গণিত বা বিজ্ঞানের শিক্ষক নেই। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে এক্স-রে 
বা আলট্রাসনোগ্রাফি মেশিন থাকলেও টেকনিশিয়ানের অভাবে সেগুলো অচল পড়ে আছে। ফলে মানুষ আজও সুচিকিৎসার জন্য ঢাকা বা বিদেশমুখী হতে বাধ্য হচ্ছে।
গবেষক মতিউর রহমান ও অর্থনীতিবিদ আজাহার আলীর মতে, এই ব্যর্থতার মূলে রয়েছে জবাবদিহিতার অভাব এবং রাজনৈতিক সিন্ডিকেট। ঠিকাদারি লাইসেন্স ভাড়া দেওয়া এবং 
সাব-কন্ট্রাক্টরের মাধ্যমে কাজ করানোর ফলে মান নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বদলে স্বল্পমেয়াদি ‘আইওয়াশ’ প্রকল্পই বগুড়াকে পিছিয়ে দিয়েছে।
জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান বলেন, ‘জেলা উন্নয়নের বাজেটের আওতায় সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরই তাদের নিজস্ব প্রকল্প বাস্তবায়ন করে থাকে। প্রকল্পগুলো জনগুরুত্বপূর্ণ কিনা বা কতটা টেকসই হচ্ছে, তা নিশ্চিত করার প্রাথমিক দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর। তবে জেলা প্রশাসন সামগ্রিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করে। বিগত বছরগুলোতে বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলোর গুণগত মান বা কার্যকারিতা নিয়ে যেসব প্রশ্ন উঠেছে, প্রয়োজনে আমরা সে বিষয়ে খোঁজ নেব এবং গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখব।’

আরও পড়ুন

×