গোমতী নদীর পার থেকে অবাধে মাটি কেটে বিক্রি
কুমিল্লার তিতাস উপজেলার ভিটিকান্দি ইউনিয়নের জগতপুর এলাকায় গোমতী নদীর পার কেটে মাটি বিক্রি সমকাল
বাঞ্ছারামপুর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৮:১৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
কুমিল্লার তিতাস উপজেলার গোমতী নদীর তীর থেকে ও নদীর পাশের খাসজমি থেকে মাটি কেটে বিক্রি করার অভিযোগ উঠেছে। কয়েক মাস ধরে এই কার্যক্রম চললেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না থাকায় বেপরোয়া হয়ে উঠেছে চক্রটি। এ ঘটনায় উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এলাকাবাসী।
চক্রটি দিনের আলোতেই নদীর তীর ও খাসজমি থেকে মাটি কেটে ট্রাক্টরে করে বিভিন্ন স্থানে নিয়ে বিক্রি করছে। ভোরের আলো ফোটার আগেই কিংবা দিনের ব্যস্ত সময়ে নদীর তীরের এই মটি কেটে নেওয়া হচ্ছে। মাটি কেটে নেওয়ায় নদীপারে তৈরি হয়েছে গভীর ক্ষত। গোমতী নদীপারের মানুষের একটাই দাবি– গোমতীকে বাঁচান। এখনই মাটি কাটা বন্ধ না হলে আগামী বর্ষায় নদীপারে দেখা দিতে পারে ভাঙন, হারিয়ে যেতে পারে বহু মানুষের বাস্তুভিটা। স্থানীয় প্রশাসন কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রতিবছর গোমতীর তীর থেকে মাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছে চক্রটি।
সরেজমিন দেখা গেছে, জগতপুর ন্যাশনাল ব্রিকস মেনুফেকচার নামে একটি ইটভাটার পূর্ব পাশের গোমতী নদীর পারসহ কয়েক বিঘা জমি থেকে সাত-আট ফুট গভীর করে মাটি কেটে নেওয়া হয়েছে। কয়েকটি ট্রাক্টর দিয়ে এই মাটি উপজেলা বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। যে জায়গা থেকে মাটি কাটা হচ্ছে এটি গোমতী নদীর একটি বাঁক, বর্ষা মৌসুমে এই এলাকায় এমনিতে ভাঙন দেখা দেয়। ভিটিকান্দি ইউনিয়নের দরিকান্দি গ্রামের এমএমআর ব্রিকস নামে একটি ইটভাটার পশ্চিম পাশের নদীপারের খাসজমি থেকে ভেকু দিয়ে মাটি কেটে ট্রাক্টরে করে নিয়ে বিক্রি করছেন কয়েকজন লোক। ইতোমধ্যে দেড় বিঘার মতো জায়গায় সাত-আট ফুট গভীর করে মাটি কেটে নেওয়া হয়েছে।
এলাকাবাসী জানান, এই জায়গাটি খাস। আগে নদী ছিল, চর জেগে ভরাট হয়ে গেছে। কলাকান্দি ইউনিয়নের মানিকনগর গ্রামের পাশে গোমতী নদীর তীরবর্তী জমি থেকে মাটি কেটে ইটভাটায় বিক্রি করছেন স্থানীয় কয়েকজন। এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রতিবছর এই এলাকা থেকে মাটি কেটে বিভিন্ন ইটভাটায় বিক্রি করা হয়। কিন্তু স্থানীয় প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয় না।
জগতপুর গ্রামের গৃহবধূ জোসনা বেগম জানান, বর্ষা এলেই ঘুম হয় না। যদি রাতে পার ভেঙে ঘর নদীতে চলে যায়। শুধু নদীর তীর নয়, ফসলি মাঠের পাশের খাসজমিও রেহাই পাচ্ছে না। এতে জমির স্বাভাবিক গঠন নষ্ট হচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষি ও পরিবেশে। মাটি কাটা বন্ধ না করলে বর্ষায় বড় বিপদ হবে।
দরিকান্দি গ্রামের সফিক মিয়া বলেন, নদীর তীর এভাবে কেটে নেওয়া হলে বর্ষায় বড় ধরনের নদীভাঙন দেখা দেবে। বসতভিটা ও কৃষিজমি ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। অথচ প্রকাশ্যে মাটি কাটলেও কেউ কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। খাসজমি থেকে অবৈধভাবে মাটি সরিয়ে নেওয়ায় আশপাশের ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে।
দরিকান্দি এলাকার মাটি কাটার ভেকু চালক হানিফ মিয়ার ভাষ্য, ঢাকা থেকে ভেকুটি এনেছেন স্থানীয় বাবু ও ফয়সাল নামে দুই ব্যক্তি। রাতে মাটি কেটে পাশের ইটভাটায় দেওয়া হচ্ছে। গত রোববার তাদের এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। বাবু ও ফয়সালের মোবাইল ফোন নম্বর ও পরিচয় জানতে চাইলে তিনি বলতে রাজি হননি।
ভিটিকান্দি ইউনিয়ন সহকারী ভূমি কর্মকর্তা সাজেদা বেগম জানান, মাটি কাটার বিষয়টি উপজেলা সহকারী কমিশনারকে জানিয়েছেন তিনি। ন্যাশনাল ব্রিকসের পাশে যেখান থেকে মাটি কাটা হচ্ছে, এটি ব্যক্তিগত জায়গা। ব্যক্তিগত জায়গা থেকে এভাবে মাটি কাটা যায় কিনা, এই প্রশ্নে তিনি উপজেলা সহকারী কমিশনারের (ভূমি) সঙ্গে কথা বলতে বলেন। তাঁর সঙ্গে মাটি ব্যবসায়ীদের যোগাযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অস্বীকার করে বলেন, কাউকে চেনেন না তিনি। দরিকান্দির যে জায়গা থেকে মাটি কাটা হচ্ছে, এটি খাস কিনা জানতে চাইলে তিনি ফোনকল কেটে দেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুমাইয়া মমিনের ভাষ্য, নদীর তীর বা খাসজমি থেকে অনুমতি ছাড়া মাটি কাটার কোনো সুযোগ নেই। বিশেষ করে, যে কোনো জমি থেকে ‘টপ সয়েল’ কাটার কোনো সুযোগ নেই। কৃষি কর্মকর্তা কমিটির সদস্য সচিব, তাঁর সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দিয়ে বলেন, এ রকম হলে তিনি বাধা দেবেন। দরিকান্দিতে অভিযান চালানো হয়েছিল, অন্যগুলোর বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হবে এবং সত্যতা পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
- বিষয় :
- মাটিকাটা
