ওয়াসার পয়ঃনিষ্কাশন প্রকল্পের পাইপ বসানোর কাজ বন্ধ
নগরীর বিভিন্ন সড়কে ওয়াসার পয়ঃনিষ্কাশন পাইপ ও ম্যানহোল স্থাপনের কাজ চলছে
হাসান হিমালয়, খুলনা
প্রকাশ: ২১ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:৪৯ | আপডেট: ২১ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৮:৩১
| প্রিন্ট সংস্করণ
ওয়াসার পয়ঃনিষ্কাশন প্রকল্পের পাইপ স্থাপনের কাজ বন্ধ রাখতে চিঠি দিয়েছে খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি)। নির্বাচনের আগে সড়ক খনন বন্ধ রাখা এবং খোঁড়া সড়ক কারা মেরামত করবে– এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত কাজ বন্ধ রাখতে গত ৪ জানুয়ারি চিঠি দেয় সংস্থাটি। এর পরই থেমে যায় ‘খুলনা শহরের পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন’ প্রকল্পের কাজ।
ওয়াসার কর্মকর্তারা জানান, প্রকল্পের আওতায় নগরীর ভেতরে ২৫৫ কিলোমিটার পাইপলাইন স্থাপন করা হচ্ছে। পুরোটাই হচ্ছে সড়কের নিচে। এর মধ্যে ২১৫ কিলোমিটার সড়ক কেসিসির। মাটির ২০ থেকে ২৫ ফুট গভীরে অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে এই পাইপলাইন স্থাপন হচ্ছে। শুষ্ক মৌসুম ছাড়া এই কাজ করা যায় না। বর্তমানে ১১টি সড়কে পাইপলাইন ও ম্যানহোল স্থাপনের কাজ চলছে। ফেব্রুয়ারিতে আরও ১৫টি সড়কে পাইপ স্থাপনের পরিকল্পনা ছিল। কেসিসির চিঠির পর সব কাজ থেমে গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পাইপ স্থাপনের জন্য খোঁড়া সড়ক ও মেরামত নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরেই কাজ বন্ধ করে দিয়েছে কেসিসি। সড়ক মেরামতের জন্য ৬১২ কোটি টাকা চেয়েছে কেসিসি। কিন্তু ওয়াসার পয়ঃনিষ্কাশন প্রকল্পে এই খাতে বরাদ্দই রয়েছে মাত্র ২৪৮ কোটি টাকা। এ ছাড়া প্রথম দফায় কেসিসিকে দেওয়া ১১২ কোটি টাকার পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনও ওয়াসাকে দেয়নি সংস্থাটি। এই পরিস্থতিতে স্থানীয় সরকার সচিবের মধ্যস্থতায় গত ডিসেম্বর থেকে খোঁড়া সড়ক নিজেরা সংস্কারের সিদ্ধান্ত নেয় ওয়াসা। এতেই চটেছে কেসিসি।
গত ৪ জানুয়ারি ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালককে কাজ বন্ধ রাখার চিঠি দেন কেসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রাজিব আহমেদ। চিঠিতে বলা হয়, সংসদ নির্বাচনের আগে জনসাধারণ ও যানবাহন চলাচলের সুবিধার্থে যেসব রাস্তা এর আগে খনন করা হয়েছে, সেগুলো মেরামত করাসহ নতুন রাস্তা খনন থেকে বিরত থাকতে মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এর আগে ২০২৩ সালের এপ্রিলে নির্বাচনের আগে প্রকল্পের কাজ বন্ধ করে দিয়েছিলেন তৎকালীন মেয়র তালুকদার আবদুল খালেক। ওই বছর অক্টোবর পর্যন্ত পাইপলাইন স্থাপনের কাজ বন্ধ ছিল। গত বছর অতিবৃষ্টির কারণে জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত চার মাস কাজ বন্ধ ছিল। ওয়াসা থেকে জানা গেছে, খুলনা নগরের গৃহস্থালি, মানুষ ও শিল্পবর্জ্য নিষ্কাশন হয় উন্মুক্ত পরিবেশে। বাসাবাড়ির সেপটিক ট্যাঙ্ক থেকে পানি বাড়ির পাশের ছোট ড্রেন, সেখান থেকে বড় ড্রেন, এরপর খাল দিয়ে বর্জ্য নদীতে চলে যায়। নগরবাসীর দাবির মুখে পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা আধুনিকায়ন প্রকল্প শুরু করে ওয়াসা। প্রায় দুই হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রকল্পটি ২০২০ সালের ২৮ জুলাই একনেকে অনুমোদন হয়। এর বড় অংশ দিচ্ছে এডিবি। জমি অধিগ্রহণের পর মাঠ পর্যায়ের কাজ শুরু হয় ২০২২ সালের অক্টোবরে। ২০২৭ সালের জুনে কাজ শেষ করার কথা ছিল।
প্রকল্পের আওতায় নগরীর ১৫ থেকে ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের ২৭ হাজার বাড়ির পয়ঃবর্জ্য সংগ্রহ করে শোধনাগারে নেওয়া হবে। এ জন্য নগরীর ভেতরে ২৫৫ কিলোমিটার পাইপলাইন, প্রায় ১১ হাজার ম্যানহোল, ২৭ হাজার গৃহসংযোগ, দুটি শোধনাগার এবং আটটি পাম্পস্টেশন নির্মাণের কাজ চলছে। যন্ত্রের মাধ্যমে পাইপ স্থাপন এবং ম্যানহোল স্থাপনের জন্য ৫০ থেকে ১০০ মিটার পরপর সড়কের কিছু অংশ খুঁড়তে হচ্ছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা জানান, ইতোমধ্যে ২১৫ কিলোমিটার পাইপ স্থাপনের কাজ শেষ হয়েছে। সাড়ে সাত হাজার ম্যানহোল স্থাপন করা হয়েছে। সাব-স্টেশন ও শোধনাগারের কাজ চলছে। প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি প্রায় ৭০ শতাংশ। এমন সময় কেসিসির চিঠি সামগ্রিক কাজে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেসিসির প্রধান প্রকৌশলী মশিউজ্জামান খান বলেন, ম্যানহোল বসানোর জন্য ২০ ফুট গর্ত খুঁড়লে সড়কের আশপাশের অংশও সেই গর্তে ধসে পড়ে। কোথাও সড়কের বড় অংশ দেবে যায়। তখন সড়ক পুরোটাই মেরামত করতে হয়। এ জন্য খরচ হয় বেশি। এ ছাড়া ওয়াসা সড়ক খুঁড়লেও নগরবাসী কেসিসির ওপর সংক্ষুব্ধ হয়। এ কারণে কাজ বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে।
তিনি বলেন, সড়কগুলো যেহেতু কেসিসি নির্মাণ করেছে, সে জন্য মেরামতের দায়িত্ব কেসিসিকেই দেওয়া যৌক্তিক। ওয়াসা চাইলে ৬৪১ কোটি টাকার প্রাক্কলন আবার সংশোধন করা যাবে। এতে খরচ অনেকটা কমবে।
খুলনা ওয়াসার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক খান সেলিম আহমেদ বলেন, প্রথম পর্যায়ে সড়ক মেরামতের ব্যয় ছিল ১৩০ কোটি টাকা। পরে তা বাড়িয়ে ২৪৮ কোটি টাকার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এডিবি ওয়াসা যেটুকু খুঁড়ছে শুধু সেটুকু মেরামতের জন্য ক্ষতিপূরণ দেবে। বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রণালয়ে বৈঠক হয়েছে। সেখানে সমাধানও হয়েছে। তারপরও কেসিসির চিঠির যৌক্তিকতা বুঝতে পারছি না। কেসিসির চিঠি পেয়ে ১৫টি সড়কের কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এর আগে ২০২৩ সালে আট মাস কাজ বন্ধ ছিল। এতে কমপক্ষে দুই বছর প্রকল্পের কাজ পিছিয়ে গেল।
- বিষয় :
- কেসিসি
