জামায়াত প্রার্থীর প্রত্যাবর্তনে ত্রিমুখী লড়াইয়ের আভাস
তাসভীর-উল ইসলাম, মাহবুবুল আলম সালেহী, আব্দুস সোবাহান
উলিপুর (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৩ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:৫৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আইনি লড়াইয়ে প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন কুড়িগ্রাম-৩ (উলিপুর) আসনের বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ব্যারিস্টার মাহবুবুল আলম সালেহী। তাঁর এই প্রত্যাবর্তনে উলিপুরের নির্বাচনী মাঠে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে।
স্থানীয় ভোটার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াত প্রার্থীর উপস্থিতিতে এখন বিএনপি ও জাতীয় পার্টির মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
গত ১ জানুয়ারি হলফনামায় দ্বৈত নাগরিকত্বের তথ্য থাকার অভিযোগে জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা অন্নপূর্ণা দেবনাথ জামায়াত প্রার্থী ব্যারিস্টার মাহবুবুল আলম সালেহীর মনোনয়নপত্র বাতিল করেছিলেন। তবে হাল না ছেড়ে নির্বাচন কমিশনে আপিল করেন। দীর্ঘ শুনানি শেষে নির্বাচন কমিশন তাঁর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করে। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর তিনি নির্বাচনে ফেরার সুযোগ পান। এতে জামায়াত নেতা–কর্মীদের মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে।
এই আসনে প্রধান দলগুলোর প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন–বিএনপির তাসভীর-উল ইসলাম, জাতীয় পার্টির আব্দুস সোবাহান, জামায়াতে ইসলামীর ব্যারিস্টার মাহবুবুল আলম সালেহী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ডা. মো. আক্কাস আলী সরকার এবং গণঅধিকার পরিষদের সরকার মো. নুরে এরশাদ সিদ্দিকী।
ঐতিহাসিকভাবে এ আসনটি জাতীয় পার্টির দুর্গ হিসেবে পরিচিত। ১৯৭৯ সালে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এখান থেকে নির্বাচিত হওয়ার পর বিভিন্ন সময়ে জাপার প্রার্থীরাই জয়ী হয়েছেন। তবে একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে। এবার আওয়ামী লীগের প্রকাশ্য প্রভাব না থাকায় মূল লড়াই হবে বিএনপি, জামায়াত ও জাপার মধ্যে। বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াত মরিয়া হয়ে উঠেছে জাপার এই ‘দুর্গ’ গুঁড়িয়ে দিতে।
তিস্তা রক্ষায় বিষয়টি মাথায় রেখে চরাঞ্চলের সাধারণ মানুষের মধ্যে বিএনপি প্রার্থী তাসভীর-উল ইসলামকে নিয়ে বিশেষ আগ্রহ দেখা গেছে।
থেতরাই ইউনিয়নের তিস্তাচরের কৃষিশ্রমিক আব্দুস সামাদ ও রাবেয়া বেগম সমকাল প্রতিবেদককে জানান, তিস্তা তাদের প্রাণ। এ নদীর ভাঙন রোধে যারা ভূমিকা রাখবেন, তারা তাঁকেই ভোট দেবেন। বিএনপি প্রার্থীর তিস্তা বাঁচাও আন্দোলন তাদের আশাবাদী করে তুলেছে।
উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক তারেক আবু আলা চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের প্রার্থী তাসভীর-উল ইসলাম একজন ক্লিন ইমেজের মানুষ। তার পরিবার এলাকার উন্নয়নে দীর্ঘকাল কাজ করেছে। মরিয়ম চক্ষু হাসপাতাল ও শিক্ষার উন্নয়নে তার অবদান মানুষ মনে রেখেছে। আমরা শতভাগ নিশ্চিত যে বিএনপির হারানো আসনটি এবার উদ্ধার হবে।’
জামায়াত প্রার্থী ব্যারিস্টার মাহবুবুল আলম সালেহী বলেন, ‘প্রার্থিতা বাতিলের ঘটনায় সাধারণ মানুষের সহানুভূতি ও আগ্রহ আমার প্রতি বেড়েছে। মানুষ পরিবর্তন চায় এবং ইনশাআল্লাহ সবার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেই আমরা জয়ী হব।’ তবে জেলা জামায়াতের সূরা সদস্য আব্দুল জলিল সরকার অভিযোগ করেন, প্রশাসনের ভূমিকা নিরপেক্ষ নয় এবং লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি হয়নি।
জাতীয় পার্টির প্রার্থী আব্দুস সোবাহান বলেন, ‘ভোটের মাঠে ধরপাকড় ও ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে। যদি হিন্দু ভোটারসহ সবাই নির্ভয়ে ভোট দিতে পারেন এবং উৎসবমুখর পরিবেশ বজায় থাকে, তবে জাতীয় পার্টি বিপুল ভোটে জয়ী হবে।’
উলিপুরের চরাঞ্চল থেকে শুরু করে শহর–সর্বত্রই এখন নির্বাচনী উত্তাপ। প্রতীক বরাদ্দের পর প্রার্থী ও সমর্থকরা ব্যস্ত সময় পার করছেন। ব্যারিস্টার সালেহীর প্রার্থিতা ফিরে পাওয়া একদিকে যেমন জামায়াতের ভোট ব্যাংককে সুসংহত করেছে, অন্যদিকে তা প্রধান তিন দলের মধ্যে ভোটের লড়াইকে অত্যন্ত কঠিন করে তুলেছে। শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোটাররা উন্নয়নের নাকি পরিবর্তনের পক্ষে রায় দেন, তা দেখার অপেক্ষায় পুরো জেলা।
উলিপুর উপজেলার একক এলাকা নিয়ে গঠিত কুড়িগ্রাম-৩ আসন। তিস্তা, ধরলা ও ব্রহ্মপুত্র নদ-নদী বেষ্টিত এই জনপদে ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৬৮ হাজার ৪৭০ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৮৩ হাজার ৬৪ জন এবং নারী ভোটার ১ লাখ ৮৫ হাজার ৪০৬ জন। ভোটারদে সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নারী ভোটাররাই এখানে জয়ের অন্যতম নিয়ামক হতে পারেন।
- বিষয় :
- প্রচারণা
