‘এইবার তারেক যদি হামার তিস্তার একটা হিল্লা করি দেয়’
রংপুরে তারেক রহমানের নির্বাচনী জনসভায় যোগ দিতে দূর-দূরান্ত থেকে ভ্যানে করে আসেন তিস্তাপারের মানুষরা। ছবি: সমকাল
স্বপন চৌধুরী, রংপুর
প্রকাশ: ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ | ২০:৪৫
‘দেকতে দেকতে বুড়া হয়্যা গেনু বাহে, তিস্তার একটা হিল্লা (সমাধান) হইল না। এদ্দিন তিস্তার কথা কয়্যা সবায় খালি ভোট নিচে, কায়ও কাম (কাজ) করে নাই। এইবার তারেক যদি হামার তিস্তা প্রকল্পের একটা হিল্লা করি দেয়!’ বার বার স্বপ্নভঙ্গের পরও তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে এমন আশার কথা বলেন রংপুরে তারেক রহমানের নির্বাচনী জনসভায় আসা গঙ্গাচড়ার ছালাপাক চরের ষাটোর্ধ রহমত আলী।
শুক্রবার সকালে বাড়ি থেকে রওনা করেন তিনি। অন্তত ২০ কিলোমিটার হেঁটে রংপুর শহরের রাধাবল্লভ মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করে জনসভাস্থল কালেক্টরেট ঈদগাহ মাঠের কাছে রংপুর সরকারি কলেজ মাঠের কোণায় বসেছিলেন রহমত আলী। এলাকার অন্যদের সঙ্গে অপেক্ষা করছিলেন তিস্তা নিয়ে তারেক রহমানের কথা শোনার জন্য। তার মতো তিস্তার চরাঞ্চলে বসবাসকারী দিনমজুরসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষজন কাজকর্ম বন্ধ রেখে অনেক স্বপ্ন নিয়ে তারেক রহমানের জনসভায় যোগ দেন।
জনসভায় চরাঞ্চল থেকে আসাদের মধ্যে লহ্মীটারী ইউনিয়নের মহিপুর এলাকার আমিনুর রহমান বলেন, ‘তিস্তায় তো হামার কপাল খাইচে বাহে। অন্তত দশবার বাড়ি ভাঙি নদীত গেইচে। জমি-জায়গাও শ্যাষ। এ্যালা মাইনসের কাম (কাজ) করি খাই। তারপরও চাই তিস্তা সমস্যার সমাধান হউক। তখন হামরা বাঁচি না থাকলেও নদীপারের মানুষ ভালো থাকপে।’
কোলকোন্দ ইউনিয়নের গোডাউনেরহাট এলাকার মোন্নাফ আলী বলেন, ‘এ পর্যন্ত ১০ বার নদীভাঙনে নিঃস্ব হয়েছি। এখন স্ত্রী ও দুই সন্তানসহ আশ্রয়ণ কেন্দ্রের বাসিন্দা। এতদিন সবাই শুধু তিস্তা মহাপরিকল্পনার আশা দিয়েছে। কাজের কাজ কিছুই হয়নি।’ সবশেষে তিস্তা নিয়ে তারেক রহমানের কথা শোনার জন্য জনসভায় এসেছেন তিনি।
বৃহত্তর রংপুরের পাঁচ জেলার ১১৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে তিস্তা নদী একসময় এ অঞ্চলের মানুষের মায়ের মতো আপন ছিল। আজ সেই তিস্তাই নদীপারের মানুষের দুঃখের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উজানে গজলডোবা ব্যারাজের মাধ্যমে ভারত পানি নিয়ন্ত্রণ করায় শুকনো মৌসুমে নদীতে পানি মেলেনা। মরুময় অবস্থার সৃষ্টি হওয়ায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে প্রাণ-প্রকৃতিতে। বন্যায় দু’কূল উপচে সৃষ্ট বন্যায় ঘরবাড়ি ভাসিয়ে নিয়ে যায়। তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যাসহ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবিতে তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলন, তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের আন্দোলন-সংগ্রামেও নদীপারের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি। সর্বশেষ বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দাবি ওঠে মহাপরিকল্পনার কাজ শুরু করার। এই প্রকল্পের মাধ্যমে লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, কুড়িগ্রাম গাইবান্ধায় ১১৫ কিলোমিটার নদীতে এক হাজার ৩৩০ লাখ ঘনমিটার ড্রেজিং করার কথা রয়েছে। তীর রক্ষা, বাঁধ নির্মাণ ও মেরামত, ৬৭টি গ্রোয়েন বা স্পার নির্মাণ ও মেরামত, নদীর দুই ধারে সড়ক নির্মাণ, ১৭০ দশমিক ৮৭ বর্গকিলোমিটার ভূমি পুনরুদ্ধার ও উন্নয়ন করা হবে। চীন সরকারের সহায়তায় এই প্রকল্প বাস্তায়নের কথা। কিন্তু সম্প্রতি পানিসম্পদ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনসহ ভাঙরপ্রবণ এলাকা পরিদর্শন করে জানান, তিস্তা প্রকল্প নিয়ে ভালো করে যাচাই-বাছাই চলছে; যাতে কোনো ভুল না হয়। যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রকল্পটির কাজ শুরু করা যাচ্ছে না। এতে আবারও হতাশ হয়ে পড়ে তিস্তাপারের মানুষ। নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় প্রকল্প বাস্তবায়নে তারা তারেক রহমানকে নিয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখছেন।
চরাঞ্চল থেকে তারেক রহমানের জনসভায় আসা একাধিক মানুষ জানায়, মাস যায়, বছর যায়, যুগ পেরিয়ে যায়, তিস্তা সমস্যার সমাধান হয়না। বারবার আশায় বুক বাঁধে নদীপারের মানুষ, তবু দুর্গতি তাদের পিছু ছাড়েনা। খরায় শুকিয়ে মারে-বন্যায় সবকিছু ভেসে যায়। ভাঙনে সব হারিয়ে ঠিকানা বদলাতে হয় প্রতি বছর। কিন্তু এবারে তারা আর বিগত সময়ের মতো প্রতারণার শিকার হতে চাননা। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেই অন্তত তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজ শুরু করার আশা ছিল তাদের, সেটাও হয়নি। সর্বশেষ ভরসা তারেক রহমান। তার কথা শুনতেই নদীপারের হাজারো মানুষ পায়ে হেঁটে বা রিকশাভ্যানে ছুটে আসেন এই জনসভায়।
গঙ্গাচড়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি চাঁদ সরকার বলেন, রংপুরে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্বাচনী জনসভায় তিস্তার চরের ১০ হাজারের বেশি মানুষ অংশ নেয়।
- বিষয় :
- রংপুর
- তিস্তা
- তারেক রহমান
- বিএনপি
