ঢাকা শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬

১৯ মাস পর রহস্য উদ্ঘাটন পিবিআইয়ের

‘ফ্রি ফায়ার’ গেম নিয়ে বিরোধের জেরে স্কুলছাত্র খুন

‘ফ্রি ফায়ার’ গেম নিয়ে বিরোধের জেরে স্কুলছাত্র খুন
×

ছবি : সংগৃহীত

কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৪ মার্চ ২০২৬ | ০৫:২০

কিশোরগঞ্জে মোবাইল ফোনে ‘ফ্রি ফায়ার গেম’ খেলা নিয়ে বিরোধের জেরে প্রতিপক্ষের হাতে সপ্তম শ্রেণির এক ছাত্র খুন হয়েছে। ‘ক্লু’বিহীন এ খুনের ঘটনার ১৯ মাস পর রহস্য উদ্ঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এ ঘটনায় চার আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একজন আদালতে স্বীকারোক্তি দিয়েছে। অপর তিনজনকে রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছে।

জেলা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন সুপার (এসপি) মিজানুর রহমান মঙ্গলবার দুপুরে তাঁর কার্যালয়ে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানিয়েছেন।

পুলিশ সুপার জানান, নিকলী উপজেলার সাজনপুর বাগপাড়া গ্রামের কৃষক নজরুল ইসলামের সপ্তম শ্রেণিপড়ুয়া ছেলে রাহিম (১৪) মোবাইলে ফ্রি ফায়ার খেলাকে কেন্দ্র করে ২০২৪ সালের ২ আগস্ট খুন হয়। প্রতিবেশী বাচ্চু মিয়ার ছেলে তোফাজ্জল (২২) রাহিমের বাঁ চোখের ওপরের দিকে ছুরিকাঘাত করে।

এ সময় তোফাজলের মা শাবানা বেগম, চাচা জসিম উদ্দিন ও নানা মরম আলী হাত-পা চেপে ধরে ছালা দিয়ে বুকের ওপর দাঁড়িয়ে থেকে রাহিমের মৃত্যু নিশ্চিত করে। পরে বাড়ির সামনের পুকুরের সিঁড়ির নিচে ফেলে রেখে আসে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত চারজন গ্রেপ্তার হলেও খুনি তোফাজ্জলকে তার বাবা বাচ্চু মিয়া সৌদি আরবে নিয়ে গেছে।

ঘটনার পরদিন সকালে রাহিমের স্বজনরা তাঁকে খুঁজতে বেরিয়ে গ্রামের পুকুরের সিঁড়ির নিচ থেকে লাশ উদ্ধার করেন। প্রথমে ঘটনাটি অনুদ্ঘাটিত ছিল। এ ছাড়া তখন দেশব্যাপী আন্দোলন চলার কারণে লাশের ময়নাতদন্ত ছাড়াই দাফন করা হয়। কিন্তু রাহিমের মোবাইল ফোনের কললিস্ট দেখে তাঁর বাবা নজরুল ইসলাম কিশোরগঞ্জের ৪ নম্বর আমলি আদালতে ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর প্রতিবেশী রজব আলীর ছেলে মো. শরিফ (২০), প্রবাসী বাচ্চু মিয়ার ছেলে তোফাজ্জলসহ (২২) অজ্ঞাত চার-পাঁচজনের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

আদালত থেকে নিকলী থানার ওসিকে মামলার তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার আদেশ দেন। থানার এসআই হত্যাকাণ্ডের কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি মর্মে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেন। বাদী নজরুল ইসলাম এই প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি আবেদন জানালে আদালত পিবিআইকে তদন্তের আদেশ দেন।

পিবিআইর পরিদর্শক টিটু চৌধুরী তদন্তের দায়িত্ব পান। দীর্ঘদিন তদন্তের পর তাঁর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত নিকলী থানাকে নির্দেশ দিলে গত ৫ ফেব্রুয়ারি জিআর মামলা হিসেবে রেকর্ড করা হয়। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি প্রধান আসামি শরিফকে তদন্ত কর্মকর্তা রাজধানীর হাজারীবাগ থানাধীন কাজিরবাগ এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হন। 

পরদিন তাঁকে জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম মো. এমরানের আদালতে হাজির করলে শরিফ ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে হত্যাকাণ্ডের পুরো ঘটনা বর্ণনা করে। তার বর্ণনামতে ২৮ ফেব্রুয়ারি মামলার ২ নম্বর আসামি তোফাজ্জলের মা শাবানা বেগম, চাচা জসিম উদ্দিন ও নানা মরম আলীকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। তবে খুনি তোফাজ্জলকে তার বাবা আগেই সৌদি আরবে নিয়ে যাওয়ায় তাকে গ্রেপ্তার করা যায়নি।

জবানবন্দিতে শরিফ জানায়, নিহত রাহিম ফ্রি ফায়ার গেমে প্রচণ্ড আসক্ত ছিল। তার প্রচুর সাবস্ক্রাইবার ছিল। এটা দেখে প্রতিবেশী তোফাজ্জল (২২) রাহিমের আইডি হ্যাক করে সেটি অন্যত্র বিক্রির ফন্দি করে। শরিফের মোবাইল ফোনের মাধ্যমে তোফাজ্জল ২০২৪ সালের ২ আগস্ট সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে রাহিমকে ডেকে তোফাজ্জলের ঘরে নিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর শরিফ গিয়ে দেখতে পায়, রাহিমের বাঁ চোখের ওপরে তোফাজ্জল ছুরি ঢুকিয়ে দিয়েছে। প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছে।

রাহিমের চিৎকার শুনে তোফাজ্জলের মা শাবানা বেগম, চাচা জসিম উদ্দিন ও নানা মরম আলী গিয়ে রাহিমের হাত-পা চেপে ধরে ছালা দিয়ে বুকের ওপর দাঁড়িয়ে থেকে রাহিমের মৃত্যু নিশ্চিত করে রাতে পুকুরের সিঁড়ির নিচে লাশ ফেলে আসে। শরিফ এসব দৃশ্য দেখে ফেলায় তার গলায় ছুরি ধরে এ ঘটনা কাউকে না বলার জন্য তোফাজ্জল তাকে শাসায়। তবে প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে খুনিরা শরিফকেও মেরে ফেলতে পারে মনে করে তার স্বজনরা শরিফকে ঢাকায় পাঠিয়ে দেয়।

পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, গ্রেপ্তার হওয়া শাবানা, জসিম ও মরম আলীকে তিন দিনের রিমান্ডে আনার জন্য আদালতে আবেদন জানানো হয়েছে। পরে শুনানি করে রিমান্ডের আদেশ দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন আদালত।

আরও পড়ুন

×