ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ ট্যাগে ব্যবসায়ী মহলে ক্ষোভ

‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ ট্যাগে ব্যবসায়ী মহলে ক্ষোভ
×

শরীফ উদ্দিন সবুজ, নারায়ণগঞ্জ 

প্রকাশ: ০৫ মার্চ ২০২৬ | ০৭:৫৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা) আসনের সংসদ সদস্য এনসিপির আব্দুল্লাহ আল আমিন বিকেএমইএর সভাপতিকে ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ বলায় ক্ষুব্ধ নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ী ও নাগরিক নেতৃবৃন্দ। ইফতার মাহফিলের মতো আয়োজনে একজন জনপ্রতিনিধির এমন মন্তব্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। 

ওই মাহফিলে বিকেএমইএ (বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম উপস্থিত থাকবেন তা জানতেন না বলে দাবি করেছেন এমপি আল আমিন। তবে আয়োজক জামায়াত নেতা মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান বলছেন, এ তথ্য এমপিকে আগেই জানানো হয়েছিল। তিনি বলেন, এই অপ্রীতিকর ঘটনা কাম্য ছিল না। ইফতার মাহফিলে এমপি আব্দুল্লাহ আল আমিন ছিলেন ‘প্রধান মেহমান’। বিশেষ অতিথি ছিলেন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। 

এদিকে, এমপি আল আমিনকে ঘেরাওয়ের সময় হামলায় এনসিপি কর্মী ফয়সাল আহমেদ আহত হন বলে জানান দলটির কেন্দ্রীয় সংগঠক শওকত আলী। এই ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার তারা মামলা করতে যাবেন। 
গত মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টায় নারায়ণগঞ্জের পঞ্চবটীর বিসিক শিল্পনগরীতে জামায়াতে ইসলামীর পেশাজীবী ফোরাম আয়োজিত ইফতার ও দোয়া মাহফিলে এমপি আল আমিন ওই বক্তব্য দেন। এর পর ব্যবসায়ীরা এমপিকে প্রায় দুই ঘণ্টা ঘেরাও করে রাখেন। পরে রাত ৮টার দিকে পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে। 

বিকেএমইএর সভাপতিকে কটূক্তিতে নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ীদের মধ্যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমসহ বিভিন্নভাবে তাদের আলোচনায় বিষয়টি উঠে আসছে। 
বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ও ফতুল্লা অ্যাপারেলসের এমডি ফজলে এহসান শামীম বলেন, তিনি (এমপি) আওয়ামী লীগবিরোধী কর্মকাণ্ডে খুব বেশি সক্রিয় ছিলেন কিনা, এটা আমার জানা নেই। কিন্তু আমরা তখনও সরকারের বিরোধিতা করেছি। ২০২৪ সালের ১ আগস্ট আমার নেতৃত্বে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বিবৃতি দেওয়া হয়েছে। আল আমিন সাহেব হঠাৎ এমপি হয়েছেন। ইফতার মাহফিলে কী বলা যায় কী বলা যায় না, সম্মানিত ব্যক্তিকে কীভাবে সম্মান দিতে হয়, সেটা তিনি শিখেননি। আরেকজনের দাওয়াতে গিয়ে সে দাওয়াত পণ্ড করা অভদ্রতা। 
নিতাইগঞ্জ ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি শংকর কুমার সাহা বলেন, একটা নির্বাচনের পরেও ব্যবসায়ীদের যদি ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ ট্যাগ দেওয়া হয়, তাহলে এটা ব্যবসা ও ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা সংকট তৈরি করবে। যদি ব্যবসয়ীরা ব্যাকফুটে চলে যান, তাহলে ব্যবসা কোথায় যাবে? 

নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সিনিয়র সহসভাপতি মোর্শেদ সারোয়ার সোহেল বলেন, ইফতার মাহফিলে এ ধরনের রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া ঠিক হয়নি। আবার আমরা ব্যবসায়ীরা যে উঠে এলাম, নিচে দুই ঘণ্টা অবস্থান করলাম– দুইটাই সুন্দর হয়নি। 
নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল হক দীপু বলেন, ব্যবসা-সংক্রান্ত বিভিন্ন ইস্যুতে বিকেএমইএর মতো সংগঠনের নেতাদের সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের সঙ্গে কথা বলতে হয়। কেউ যদি সরকারের বিরোধী হন, তিনি কি এসব দাবি দাওয়া-আদায় করতে পারবেন? এগুলো করতে গিয়ে অনেক সময় বাধ্য হয়ে সরকারের পক্ষে কথা বলতে হয়। তাই এসব ধরে কাউকে কোণঠাসা করার চেষ্টা ঠিক না।

নারায়ণগঞ্জ গণতান্ত্রিক আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আওলাদ হোসেন বলেন, আল আমিন সাহেবকে বুঝতে হবে তিনি এখন শুধু এনসিপি নেতা নন, একজন সংসদ সদস্যও। একজন এমপির বক্তব্য রাখার সময় আরও দায়িত্বশীল হওয়া উচিত। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর এবং এদের নেতাদের সব সময় সরকারের সঙ্গে একটা সম্পর্ক রাখতে হয়। সরকারের বিরুদ্ধে গিয়ে কোনো ব্যবসায়ী সংগঠন বা এর নেতা চলতে পারবেন না। এমপি সাহেব তো জেনেশুনেই ইফতার পার্টিতে গেছেন। তাহলে কেন এই অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করলেন? এনসিপির নেতারা যে মোহাম্মদ হাতেমের কাছ থেকে বিকেএমইএর অনুদান নিচ্ছেন– এই ছবিতে তো ফেসবুক এখন সয়লাব। তখন কি ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ কথাটি তাদের মনে ছিল না? 
ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ওই ছবিতে দেখা যায় এনসিপির মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমের কাছ থেকে একটি চেক গ্রহণ করছেন। এটি গণঅভ্যুত্থানে আহতদের চিকিৎসার জন্য বিকেএমইএর দেওয়া ৫০ লাখ টাকার চেক বলে ফেসবুকে উল্লেখ করা হয়েছে। 
এই চেক সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব ও এমপি আব্দুল্লাহ আল আমিন বলেন, এ টাকা এনসিপিকে দেওয়া হয়নি। সারজিস আলম জুলাই ফাউন্ডেশনের সিইও ছিলেন। তখন নিয়েছেন। বিকেএমইএর সভাপতি ইফতার মাহফিলে আসবেন এটা জানতেন না দাবি করে এমপি আল আমিন বলেন, এটা জানলে আমি সেখানে যেতাম না। অনুষ্ঠানের আয়োজক মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান আমাকে এই তথ্য জানায়নি। 

আলোচিত এই ইফতার মাহফিলে প্রধান অতিথি ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় শূরা সদস্য মাওলানা মাঈনুদ্দিন আহমাদ। প্রধান বক্তা ছিলেন জামায়াত নেতা মাওলানা মোহাম্মদ আব্দুল জাব্বার।
ওই মাহফিলে সভাপতিত্ব করেন এটির আয়োজক মহানগর জামায়াতের রুকন ও নারায়ণগঞ্জ পেশাজীবী ফোরামের (পূর্ব) সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান। তিনি বলেন, অনুষ্ঠানে মোহাম্মদ হাতেম সাহেব আসবেন এ তথ্য এমপি আল আমিন সাহেবকে আমরা আগেই জানিয়েছি। তিনি জানতেন না, এ তথ্য সত্য নয়। এমপি আল আমিনকে ব্যবসায়ীদের ঘেরাও করা প্রসঙ্গে আবু সুফিয়ান বলেন, আসলে তাঁকে ব্যবসায়ীরা ঘেরাও করেননি। ব্যবসায়ীরা নিচে দাঁড়িয়েছিলেন এটা বলার জন্য যে, তাদের নেতাকে ডেকে এনে এই পরিস্থিতি কেন তৈরি করা হলো। তিনি আরও বলেন, যেহেতু ব্যবসায়ীরা তাঁকে (মোহাম্মদ হাতেম) সম্মান করেন, ব্যবসায়ীদের ভোটে তিনি বিকেএমইএর সভাপতি, তাই আমরা তাঁকে সম্মান দিয়েছি। এখানে এই অপ্রীতিকর ঘটনা কাম্য ছিল না।

আরও পড়ুন

×