ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

রাজপথে অদম্য ডা. মনীষা

রাজপথে অদম্য ডা. মনীষা
×

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের প্রচারণায় সমর্থকদের সঙ্গে মনীষা চক্রবর্তী

সুমন চৌধুরী, বরিশাল 

প্রকাশ: ১০ মার্চ ২০২৬ | ০৮:১৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

সাদা অ্যাপ্রন পরে এসির নিচে বসে রোগী দেখা আর প্রেসক্রিপশন লেখাই হতে পারত তাঁর দৈনন্দিন জীবন। বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারে সুযোগ পেয়েও বিলাসী জীবনের হাতছানিকে তুচ্ছ জ্ঞান করেছেন তিনি। তাঁর কাছে চিকিৎসা মানে শুধু রোগমুক্তি নয়, বরং সমাজের গভীর ক্ষত নিরাময়ের এক নিরন্তর লড়াই। তিনি ডা. মনীষা চক্রবর্তী। বরিশাল নগরীর খেটে খাওয়া মানুষের কাছে যিনি কেবল এক নেত্রী নন, বরং ‘নির্ভরতার শেষ আশ্রয়’ বা ‘ডাক্তার দিদি’ হিসেবে পরিচিত।

১৯৯০ সালে বরিশালের কালীবাড়ি রোডের এক প্রগতিশীল পরিবারে জন্ম মনীষার। তাঁর রক্তে বইছে দ্রোহের ধারা। তাঁর পিতামহ সুধীর কুমার চক্রবর্তী ছিলেন একাত্তরের শহীদ এবং বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট তপন চক্রবর্তী, যিনি দীর্ঘকাল বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থেকে মানুষের অধিকার রক্ষায় কাজ করেছেন। 
বরিশাল সরকারি বালিকা বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং অমৃত লাল দে মহাবিদ্যালয় থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন মনীষা। তাঁর লড়াকু জীবনের শুরুটা ছিল ২০১১ সালে। তখন তিনি বরিশাল শের-ই-বাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়ের (শেবাচিম) চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী। তৎকালীন প্রভাবশালী ছাত্রসংগঠনের এক নেতা কর্তৃক ছাত্রী লাঞ্ছনার ঘটনায় যখন পুরো ক্যাম্পাস স্তব্ধ, তখন ছিপছিপে গড়নের এই মেয়েটিই প্রথম রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ‘সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট’-এর সেই আন্দোলন তছনছ করে দিয়েছিল অপরাধীদের দম্ভ। সেই শুরু, এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি তাঁকে। তাঁর নেতৃত্ব আজ শুধু বরিশালে সীমাবদ্ধ নেই। তিনি এশিয়া মহাদেশ বিশ্ব নারী সম্মেলনে সমন্বয়কের দায়িত্ব পালনসহ একাধিক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে দলের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। 

বিসিএস উপেক্ষা ও গণমানুষের রাজনীতি
সহপাঠীরা যখন উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমিয়েছেন বিদেশে, মনীষা তখন হেঁটেছেন উল্টো পথে। তিনি বর্তমানে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) বরিশাল জেলার সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ৩৫তম বিসিএসের স্বাস্থ্য ক্যাডারে সুযোগ পেয়েও যোগদান করেননি। তাঁর মতে, চিকিৎসা মানবসেবার জন্য আর রাজনীতি হলো রাজপথের লড়াকু জীবন।
নদীতীরবর্তী রসুলপুর বস্তি উচ্ছেদের প্রতিবাদ থেকে শুরু করে ব্যাটারিচালিত রিকশা শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা– সবখানেই মনীষা এক অনিবার্য নাম। বরিশাল নগরের তিনটি ওষুধ প্রস্তুতকারী কারখানা ও দুটি টেক্সটাইল মিলে তাঁর নেতৃত্বেই গড়ে উঠেছে শক্তিশালী ট্রেড ইউনিয়ন। উল্লেখ্য, তিনি বর্তমানে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবেও কাজ করছেন। 
২০২০ সালে করোনা মহামারিতে যখন পুরো দেশ গৃহবন্দি, তখন ক্ষুধার্ত মানুষের হাহাকার ঘোচাতে মনীষা গড়ে তুলেছিলেন ‘মানবতার বাজার’। বিনামূল্যে চাল, ডাল ও সবজি পৌঁছে দিয়েছেন হাজারো মানুষের দুয়ারে। রসুলপুর চর ও স্টেডিয়াম কলোনির ছিন্নমূল শিশুদের জন্য প্রতিষ্ঠা করেছেন অবৈতনিক বিদ্যালয় এবং ‘শহীদ আলতাফ মাহমুদ স্মৃতি পাঠাগার’।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে বরিশালে সামনের সারির নেতৃত্বে ছিলেন। সার্বক্ষণিক রাজপথে থেকেছেন। আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে শেবাচিমে ছুটে গেছেন। ৫ আগস্টের পর পুলিশ কয়েক দিন নিষ্ক্রিয় ছিল। এ সময়ে মনীষার নেতৃত্বে ছাত্র ফ্রন্টের কর্মীরা নগরে প্রহরীর দায়িত্ব পালন করেছেন। 

ভোটের মাঠেও অনন্য দৃষ্টান্ত
২০১৮ সালের সিটি নির্বাচনে মেয়র পদে লড়াই করতে গিয়ে মনীষা চক্রবর্তী যে নজির স্থাপন করেছেন, তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরল। নির্বাচনের দিন ভোট জালিয়াতির প্রতিবাদ করতে গিয়ে সরকারদলীয় সমর্থকদের হামলায় তাঁর হাত ভেঙে যায়। গলায় ব্যান্ডেজ ঝুলিয়ে তাঁর সেই লড়াকু ছবি আজও মানুষের মনে দাগ কেটে আছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি বরিশাল-৫ আসন থেকে অংশ নিয়েছিলেন। মজার ব্যাপার হলো, তাঁর নির্বাচনী খরচের টাকা জোগান সমাজের সাধারণ মানুষ, যারা এক বছর আগে থেকে মাটির ব্যাংকে জমিয়ে টাকা তুলে দেন।
সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের বরিশালের সভাপতি সুজন আহমেদ বলেন, নারী দিবসের এই ক্ষণে ডা. মনীষা চক্রবর্তী আমাদের মনে করিয়ে দেন, নারী মানে কেবল গৃহকোণের শোভা নয়; নারী মানেই শক্তি, নারী মানেই প্রতিরোধ। শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের জন্য তাঁর এই লড়াই আজ গ্রামীণ ও নগর 
জীবনের সীমানা ছাড়িয়ে এক নতুন ভোরের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

আরও পড়ুন

×