ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ঈদের ছুটিতে চট্টগ্রাম যেন ‘মেজবান নগরী’

ঈদের ছুটিতে চট্টগ্রাম যেন ‘মেজবান নগরী’
×

নির্বাচনের পরের ঈদে মেজবান আয়োজন। চট্টগ্রামের রাজনীতিতে রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিণত হয়। গত দুই দিনে পাঁচ এমপি ও মেয়র আয়োজিত মেজবানেও অংশ নিয়েছেন সর্বস্তরের হাজার হাজার মানুষ। ছবি: সমকাল

সারোয়ার সুমন, চট্টগ্রাম

প্রকাশ: ২৩ মার্চ ২০২৬ | ১৯:৩৬ | আপডেট: ২৩ মার্চ ২০২৬ | ২০:৩৬

বিশেষ মশলাযুক্ত গরুর মাংস, সাদা ভাত, চনার ডাল, নলার সঙ্গে ফেলন ডাল-মেজবানের পরিচিত এক মেন‍্যু যেটা তুমুল জনপ্রিয় পুরো চট্টগ্রামে। আগে মৃত্যুবার্ষিকী, আকিকা, কুলখানি বা ওরস ঘিরে এটার প্রচলন বেশি থাকলেও এখন ঈদের আপ‍্যায়নেও জায়গা দখল করে নিয়েছে এই খাবার। 

নির্বাচন পরবর্তী এবারের প্রথম ঈদে চট্টগ্রামের রাজনীতিবিদরা একের পর এক আয়োজন করছে এই মেজবান দিয়ে। জেলার রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এ বছর বড় পরিসরেই যুক্ত হয়েছে এটি। গত দুই দিনে পাঁচ এমপি ও মেয়র আয়োজিত মেজবানেও অংশ নিয়েছেন সর্বস্তরের হাজার হাজার মানুষ। 

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ও নগর বিএনপির সাবেক সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন, চট্টগ্রাম-৮ আসনের সংসদ সদস্য ও নগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহ, চট্টগ্রাম-৯ আসনের সংসদ সদস্য ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক আবু সুফিয়ান, চট্টগ্রাম-৪ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও দলের সাবেক যুগ্ম মহাসচিব আসলাম চৌধুরী ও চট্টগ্রাম-১০ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান এবারে ঈদের পরে সর্বস্তরের জনগণের জন‍্য আয়োজন করেছে মেজবান।

নগর বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী আব্দুল্লাহ আল নোমান ১৯৯১ সালে এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর মন্ত্রী হন। তখন থেকে নিয়মিতভাবে ঈদের পর দিন তিনি আয়োজন করতে থাকেন এই মেজবান। তার এই আয়োজনে দল-মত-নির্বিশেষে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের সমাগম হতো। শারীরিক অসুস্থতা এবং করোনা মহামারিতে আয়োজনে কিছুটা ছেদ পড়েছিল। 
বাবার সেই ধারাবাহিকতা রক্ষা করার নতুন উদ‍্যোগ নিয়েছেন এবার তার একমাত্র ছেলে ও বর্তমান সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান। 

এ ব্যাপারে সাঈদ আল নোমান বলেন, ১৯৯১ সালে মন্ত্রী হওয়ার পর ঈদের পরদিন মেজবান চালু করেছিলেন আবার বাবা আবদুল্লাহ আল নোমান। সেই ঐতিহ্য আমি ধরে রাখতে চাই। এবার সংসদ সদস্য হিসেবে প্রথম সংসদে গিয়েছি আমি। এই আনন্দ এলাকার মানুষের আনন্দ ভাগাভাগি করতে বাবার চালু করা মেজবান আয়োজন করেছি আমিও।’

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বিগত বছরগুলোতেও নিয়মিত মেজবানের আয়োজন করতেন। এবারও ঈদের পরদিন নেতাকর্মীদের মেজবানে আপ্যায়নের ব্যবস্থা করেছেন। নগর বিএনপি কার্যালয়সংলগ্ন স্মরণিকা কমিউনিটি সেন্টারে এই মেজবানের আয়োজন করা হয়েছে। 

চট্টগ্রাম-৮ আসনের সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ এবারে প্রথম এমপি হয়েছেন। ঈদের পরদিন চান্দগাঁওয়ে তার পৈতৃক নিবাসে মেজবানের আয়োজন করেন তিনি।

মেজবান কী

ফারসি শব্দ ‘মেজবান’ মানে মেহমানদার বা ভোজ। স্থানীয়রা একে ‘মেজ্জান’ বলে।

 এটি চট্টগ্রামের সামাজিক মেলবন্ধনের একটি বড় মাধ্যম। চট্টগ্রামের মেজবান বলতে মূলত ঝাল ও সুগন্ধিযুক্ত বিশেষ গরুর মাংসের স্বাদকে বোঝায়, যা সাধারণ রান্নার চেয়ে একটু অন‍্যরকম। চট্টগ্রামের বাইরে অন্যান্য জেলায় এই মেজবানকে জেয়াফতও বলা হয়। 

চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী মেজবানের খ্যাতি দেশব্যাপী রয়েছে। বর্তমানে এই মেজবান দেশের গণ্ডি পেরিয়ে দেশের বাইরে পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিরাও বেশ ঘটা করে এই মেজবানের আয়োজন করে থাকেন।

চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী মেজবান ১৮ দশকের দিকে প্রচলন শুরু হয়। অতীতে চট্টগ্রামের ধনী লোকেরা বিভিন্ন উৎসব উপলক্ষ্যে গরিব লোকদের উন্নতমানের খাবারের আয়োজন করতেন। সেই থেকে মেজবানের প্রচলন চলে আসছে। মেজবানে হাজার হাজার মানুষকে আপ্যায়ন করার জন্য বিপুলগরু, মহিষ জবাই করা হয়। বেশ উৎসবমুখর পরিবেশে মেজবানি খানা রান্না করা হয়। শত শত মানুষ মেজবানি খাবার রান্না করা এবং আয়োজনের ব্যাপারে সম্পৃক্ত থাকে। একসঙ্গে অসংখ্য মানুষ এখানে খাবার গ্রহণ করে থাকেন।

মেজবানি রান্নার জন্য চট্টগ্রামের বেশ কয়েকজন বিখ্যাত বাবুর্চি রয়েছেন। চট্টগ্রামের খ্যাতিমান ফারুক বাবুর্চির সঙ্গে আলাপ করে জানা যায় মেজবানি রান্নার আলাদা স্বাদ হওয়ার মূল রহস্য। তিনি জানান, মেজবানি রান্নায় তারা বিশেষ ধরনের মশল্লা ব্যবহার করে থাকেন। যার কারণে রান্না বিশেষ ধরনের সুস্বাদু হয়ে থাকে। চট্টগ্রামের দেখাদেখি দেশের অন্যান্য জেলায় মেজবানি রান্নার আয়োজন করা হচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, মেজবানি খাবারের আলাদা আকর্ষণ থাকায় এখন চট্টগ্রামের প্রতিটি খাবার হোটেলেও মেজবানি খাবারের আয়োজন করা হচ্ছে। প্যাকেজ রেটে জনপ্রতি হিসেবে মেজবানি খাবার পরিবেশন করা হয়।

আরও পড়ুন

×