ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

১৫০ টাকা শতাংশে চরের জমি লিজ

১৫০ টাকা শতাংশে চরের জমি লিজ
×

তিস্তার ভাঙনে বিলীন হয়েছে ফসলের ক্ষেত। অন্যের জমিতে মজুরি খাটতে হয় তাদের। উলিপুরের জোয়ান সেতরার চরে সমকাল

 মোন্নাফ আলী, উলিপুর (কুড়িগ্রাম) 

প্রকাশ: ২৫ মার্চ ২০২৬ | ০৮:০১

| প্রিন্ট সংস্করণ

কুড়িগ্রামের উলিপুরে পাগলা তিস্তার ভাঙা-গড়ার খেলায় একদিকে যেমন নিঃস্ব হচ্ছে হাজারো কৃষক, অন্যদিকে তাদের এই অসহায়ত্বকে পুঁজি করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে একটি প্রভাবশালী মধ্যস্বত্বভোগী চক্র। নদীভাঙনে সর্বস্ব হারানো চরের কৃষকদের আর্থিক সংকটের সুযোগ নিয়ে মাত্র ১৫০ থেকে ২০০ টাকা শতাংশ দরে পানির দামে জমি লিজ নিচ্ছে এই চক্রটি। 

এক পাশে হাহাকার, অন্য পাশে হাসির ঝিলিক
‘পাগলা তিস্তার ভাঙনে এ চর ভাঙে ও চর গড়ে। নদীর ভাঙা-গড়ায় আমগো জীবনও ভাঙে। চরের বালুর দাম আছে, মোগোরে (আমাদের) দাম নাই।’ নদীর দিকে তাকিয়ে চোখের জলে বুক ভাসিয়ে কথাগুলো বলছিলেন উলিপুরের চর গোড়াই পিয়ারের বাসিন্দা আব্দুল কাদের (৬০)। 
গত বছর ১২ একর জমিতে আলু, পেঁয়াজ, বাদাম ও সরিষা আবাদ করে প্রায় ৪ লাখ টাকার ফসল বিক্রি করেছিলেন আব্দুল কাদের। এবার সেই জমি নদীতে। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘ভাঙিল মোর জমি, বাড়িঘর। ভাঙিল মোর কপাল। মোর জমিতে ২০ জনকে আশ্রয় দিছিলাম, এবার মোর আশ্রয় নাই। শত শত মজুরি খাটাইছি, অহন নিজে মানুষের জমিতে কিষান দিচ্ছি।’
একই চরের উমর আলীর (৭৫) ১২ একর জমিও এখন নদীতে। তিনি অভিযোগ করেন, ‘কাইম’ (মূল ভূখণ্ড) ভাঙলে সরকার ব্যবস্থা নেয়, কিন্তু চর ভাঙলে কেউ দেখে না। চরের মানুষ সাহায্য চায় না, তারা কাজ চায়। একই অবস্থা দড়ি কিশোরপুর চরের মরিচা বেগমের (৪০)। তিনি জানান, ৫ একর জমি হারিয়ে তারা এখন ভূমিহীন। অভাবের তাড়নায় তাঁর স্বামী রফিকুল ইসলাম এলাকায় কাজ করতে লজ্জা পেয়ে ঢাকায় গিয়ে ভ্যান চালাচ্ছেন।
নদীর এই বৈচিত্র্যময় খেলায় একদিকে যখন দীর্ঘশ্বাস, অন্যদিকে তখন কারও চোখে সুখের হাসি। দড়ি কিশোরপুর চরের রুহুল আমিন (৬৫) জানান, ১৯৯৩ সাল থেকে তাঁর বাড়ি ও জমি তিনবার ভেঙেছে। এবার দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর তাঁর সব জমি আবার ভেসে উঠেছে। সেখানে তিনি আলু, পেঁয়াজ, রসুন ও বোরো ধানের আবাদ করেছেন। একই রকম হাসির ঝিলিক দেখা গেছে আব্দুস সামাদ (৭১), নজরুল ইসলাম ও রাবেয়া বেগমের মুখেও। চরের পলি পড়া মাটি তাদের নতুন করে স্বপ্ন দেখাচ্ছে।

স্বল্পমূল্যে জমি লিজ ও বিএডিসি বিতর্ক
স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারের বিএডিসি (বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন) নীতিমালায় সরাসরি কৃষকদের মাধ্যমে আলুবীজ উৎপাদনের কথা থাকলেও, বাস্তবে তা চলে গেছে মধ্যস্বত্বভোগীদের কবলে। ‘বিএডিসি আলুবীজ উৎপাদন খামার’ নাম দিয়ে তারা বাণিজ্যিকভাবে শত শত একর জমিতে উন্নত জাতের আলু চাষ করে বিদেশে রপ্তানির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। অথচ যে কৃষকের পলি পড়া জমিতে এই ‘সোনা’ ফলছে, সেই কৃষক আজ নিজের ভিটা হারিয়ে অন্যের জমিতে ‘কিষাণ’ দিতে বাধ্য হচ্ছেন। সরকারি প্রকল্পের সুফল সাধারণ কৃষকের দুয়ারে না পৌঁছে কেন একটি নির্দিষ্ট চক্রের পকেটে যাচ্ছে, তা নিয়ে এখন জনমনে উঠেছে নানা প্রশ্ন।
চরের এই অসহায়ত্বের সুযোগ নিচ্ছে একটি মধ্যস্বত্বভোগী চক্র। বিএডিসির আলুবীজ উৎপাদন খামারের নামে বাণিজ্যিকভাবে উন্নত জাতের ‘সানশাইন’ ও ‘কুইন এনি’ আলুর চাষ হচ্ছে শত শত একর জমিতে। স্থানীয় কৃষকদের আর্থিক সংকটের সুযোগ নিয়ে মাত্র ১৫০ থেকে ২০০ টাকা শতক দরে জমি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে দড়ি কিশোরপুর ব্লকের মালিক মো. আরাফুল আলম জানান, কৃষকরা টাকার অভাবে চাষ করতে পারে না বলে তারা ভাড়া নিয়ে চাষ করছেন। তবে বিএডিসি কুড়িগ্রামের সিনিয়র সহকারী পরিচালক মো. মিজানুর রহমান জানান, নিয়ম অনুযায়ী কৃষকদের মাধ্যমেই বীজ উৎপাদনের কথা। বড় পরিসরে কৃষক না পাওয়ায় ব্লকের মাধ্যমে করা হচ্ছে।

উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. মোস্তফা কামাল জানান, গত বর্ষায় চর গোড়াই পিয়ার, দড়ি কিশোরপুর ও জোয়ান সেতরার প্রায় ২০০ হেক্টর ফসলি জমি নদীতে বিলীন হয়েছে। তবে জেগে ওঠা চরগুলোতে বর্তমানে কোটি কোটি টাকার রবি ফসল উৎপাদন হচ্ছে। কৃষি কর্মকর্তা মো. মোশারফ হোসেন বলেন, ‘নদীভাঙনে আমাদের কিছু করার নেই, তবে আমরা ফসল উৎপাদনে সহায়তা দিচ্ছি।’ 
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিবুল হাসান স্পষ্ট জানান, নদী নীতিমালায় চর রক্ষার কোনো বিধান নেই। কাইম এলাকা রক্ষাই তাদের অগ্রাধিকার। ভবিষ্যতে নদীশাসন করা হলে তখন চরের ব্যবস্থা হতে পারে। থেতরাই ইউপি চেয়ারম্যান জানান, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে এই চরাঞ্চলেও শিল্প-কারখানা ও আধুনিক কৃষি গড়ে উঠবে। ইতোমধ্যে আলিবাবা থিম পার্ক ও সোলার প্যানেলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান চরের এই জীবন-মরণ সমস্যা সমাধানে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করার আশ্বাস দিয়েছেন।

আরও পড়ুন

×