জমিতে নোনাপানি, ফসল উৎপাদন হুমকিতে
মুফতী সালাহউদ্দিন, পটুয়াখালী
প্রকাশ: ২৭ মার্চ ২০২৬ | ০৯:১৬ | আপডেট: ২৭ মার্চ ২০২৬ | ১০:৪৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পটুয়াখালীর কৃষিজমিতে লবণাক্ত পানির কারণে ফসল উৎপাদন এখন হুমকির মুখে। গত ১০ বছরে জেলায় অন্তত ২০ ভাগ জমি অনাবাদি। তবে কৃষি বিভাগের দাবি, গত ১০ বছরে ৫ থেকে ৬ ভাগ অনাবাদি রয়েছে। এ ছাড়া কৃষি অর্থনীতিতে বিপর্যয় দেখা দেওয়ায় গত এক দশকে কৃষি পেশা ছেড়েছে ২৫ থেকে ৩০ ভাগ কৃষক। এতে কৃষিপণ্য উদপাদনও দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে এবং মুখ থুবড়ে পড়ছে পটুয়াখালীর কৃষি শস্যভান্ডার।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, জেলায় ফসলি জমির পরিমাণ রয়েছে ২ লাখ ৩ হাজার ৮১১ হেক্টর। এর মধ্যে এক ফসলি ৩২ হাজার ১৩ হেক্টর, দুই ফসলি ১ লাখ ৪০ হাজার ৬১ হেক্টর এবং তিন ফসলি ৩১ হাজার ৭৩৭ হেক্টর। জেলায় কৃষক পরিবারের সংখ্যা ২ লাখ ৬০ হাজার ২২৫ জন। এ ছাড়া অস্থায়ী পতিত ৬৮৭ হেক্টর এবং স্থায়ীভাবে পতিত জমি ১১ হাজার ৮০৫ হেক্টর। গত ১০ বছরে ৫ থেকে ৬ ভাগ জমি অনাবাদি থাকে এবং গত ১০ বছরে ১৫ থেকে ১৭ ভাগ কৃষক পরিবার কৃষি ছেড়ে অন্য পেশায় যুক্ত হয়েছে। তবে কৃষি বিভাগের এ পরিসংখ্যানের সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই।
রাঙ্গাবালী উপজেলার চালিতাবুনিয়া গ্রামের কৃষক কবির সরদার। নদীভাঙনের সঙ্গে যুদ্ধ করে দফায় দফায় সরাতে হয়েছে মাথা গোঁজার শেষ সম্বলটুকু। কৃষিকাজ করেই স্ত্রী, চার পুত্র, পুত্রবধূ ও নাতি-নাতনি নিয়ে তাঁর সংসার। নদীভাঙন এবং লবণাক্ততায় থমকে গেছে তাঁর কৃষিকাজ এবং ছেড়ে দেওয়ার উপক্রম চার দশকের কৃষি পেশা।
তিনি বলেন, ‘মুই ৪০ বছর ধইর্যা কৃষিকাম করছি। এইডা আমাগো বাপদাদার পেশা। কিন্তু লবণ পানির লাইগ্যা ক্ষ্যাতের ধান, তরমুজ, রবিশস্য আর শাক-সবজির ক্ষতি হচ্ছে। লবণাক্ততায় ফসল উৎপাদনও কইম্যা যাচ্ছে এবং কৃষকের সংখ্যাও কইম্যা গেছে। গত ১০ বছরে এইহানে অর্ধেক জমি কইম্যা গেছে। অনেক কৃষক কৃষি পেশা ছাইড়্যা দিয়া অন্য পেশায় যুক্ত হচ্ছে। মুইও কৃষি পেশা ছাইড়্যা দিছি প্রায়। জমিজমা যা ছিল তা হগোল বর্গা দিয়া দিছি। এ পেশায় অ্যাহোন লাভের চেয়ে লোকসান বেশি। লবণাক্ততার কারণে শুধু ফসলি জমিই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না; এইহানের গাছপালারও ক্ষতি হচ্ছে। বিশেষ করে ফাল্গুন থেকে বৈশাখ মাস পর্যন্ত পানিতে লবণাক্ততা বেশি থাকে। এরপর বৃষ্টি শুরু হলে লবণাক্ততা কমে যায়।’
সদর উপজেলার বদরপুর গ্রামের কৃষক কামাল হাওলাদার বলেন, ‘যেই জমিতে লবণাক্ততা রয়েছে, হেই জমিতে কোনো ফসল উৎপাদন হইব না। এই লবণাক্ত মাটিটা কীভাবে ব্যবহার করতে হইব, হেই পরামর্শ লইতে হইব হামনেগো কাছ থেইক্যা। এককথায়, লবণ পানিতে হগোল ধরনের ফসল নষ্ট হইয়্যা যায়।’
রাঙ্গাবালীর বাহেরচর গ্রামের জাকির হোসেন বলেন, ‘আমি ২১ বছর ধইর্যা হালুডি (চাষাবাদ) করছি। কিন্তু এ পেশায় আগের মতো আর লাভ নেই। এখন পদে পদে লোকসান। বর্তমানে জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাব এবং লবণাক্ত পানির কারণে কৃষি পেশায় থাকা সম্ভব হচ্ছে না। লবণ পানি ঢুকে ফসল পুড়ে যাচ্ছে এবং মাঠ-ঘাটের জমি লালচে হয়ে গেছে। জমির উর্বরতা কমে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে বর্তমানে কৃষি পেশা এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
স্থানীয় এনজিও এসডিএর নির্বাহী পরিচালক কেএম এনায়েত হোসেন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দক্ষিণ উপকূলীয় অঞ্চলে ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। বিধিসম্মত এবং অপরিকল্পিভাবে কলকারখানা ও বাড়িঘর না হওয়ায় জমির উর্বরতা শক্তি হারিয়ে যাচ্ছে। গত ১০ বছরে অন্তত ১০ ভাগ জমি কমেছে এবং কৃষক পরিবারের সংখ্যা কমেছে ২০ ভাগ। যে কারণে কৃষকরা ধীরে ধীরে এ পেশা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে অন্য পেশায় যুক্ত হচ্ছেন।
পটুয়াখালী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ ড. মোহাম্মদ আমানুল ইসলাম জানান, জলবায়ু পরিবর্তনে লবণাক্ততার প্রভাব পড়েছে ফসলি জমিতে। জেলার ২ লাখ ৩ হাজার জমির মধ্যে ৫৬ হাজার হেক্টর জমি লবণাক্ততায় আক্রান্ত। ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত লবণাক্ততার প্রভাব থাকে। তবে বৃষ্টিপাত হলে লবণাক্ততার প্রভাব কম থাকে। লবণাক্ততার মাত্রা ৮ ডিএস/মিটারের বেশি হলেই ১৫ থেকে ২৫ হাজার হেক্টর জমিতে ফসল ফলানো সম্ভব হয় না। গত ১০ বছরে ১৫ থেকে ১৭ ভাগ কৃষক পরিবার কৃষি পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় যুক্ত হয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, যে পরিমাণ রাস্তাঘাট ও প্রতিষ্ঠান হচ্ছে, হাটবাজার ও মানুষের বসতি বাড়ছে এবং নদীভাঙন বেড়েছে, তাতে কৃষিজমি কমতেই থাকবে। গত ১০ বছরে ২০ হাজার হেক্টর জমি কমেছে। পাঁচ থেকে ছয় ভাগ আবাদি জমি কমেছে। কিন্তু আশার আলো হচ্ছে, এ জেলা উপকূলীয় অঞ্চল। এখানে নতুন নতুন চর জেগে ওঠায় আবাদি জমি তৈরি হচ্ছে। তাই জমির পরিমাণ কমে যাওয়ার বিষয়টি বিপদ সংকেত হিসেবে দেখছে না কৃষি বিভাগ।
পরিসংখ্যান যা বলছে
জেলা মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট সূত্র জানায়, গত ১০ বছরে পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় আন্ধারমানিক নদীতে লবণাক্ততার হার সবচেয়ে বেশি, যা অন্য এলাকার চেয়ে তিন থেকে পাঁচ গুণ। গত পাঁচ বছরে পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, আন্ধারমানিক নদীতে ২০২০ সালে লবণাক্ততার পরিমাণ ছিল ৭ দশমিক ৩৯ ডিএস/মিটার; ২০২১ সালে ছিল ২৭ দশমিক ৮০ ডিএস/মিটার; ২০২২ সালে ছিল ১৮ দশমিক ৯ ডিএস/মিটার; ২০২৩ সালে ছিল ২৮ দশমিক ৮২ ডিএস/মিটার এবং ২০২৪ সালে ছিল ১৯ দশমিক ৭৩ ডিএস/মিটার।
মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের পটুয়াখালী আঞ্চলিক কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আশিক এলাহী জানান, পটুয়াখালী উপকূলে লবণাক্ততার হার একটু বেশি। বিশেষ করে মার্চ থেকে মে পর্যন্ত তিন মাস লবণাক্ততার প্রভাব বেশি থাকে। মূলত জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এমনটি হচ্ছে।
বৃষ্টিপাত কমছে
অতিরিক্ত গরম, অনাবৃষ্টি, প্রচণ্ড খরা, তাপদাহ এবং স্বাভাবিকের চেয়ে বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় আবহাওয়ার বিরূপ প্রভাব পড়েছে এবং দেখা দিয়েছে পরিবেশ বিপর্যয়। শীত ও গ্রীষ্ম মৌসুমে নদ-নদী ও খাল-বিলের পানি শুকিয়ে যায় এবং পানির প্রবাহ কম থাকায় সাগরের লবণাক্ত পানি স্থলভাগের কাছে চলে আসে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টিপাতের পরিমাণও কমে যাচ্ছে এবং কৃষিজমিতে লবণাক্ততা বাড়ছে আশঙ্কাজনকভাবে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিসংখ্যানে গত ১০ বছরে ২০১৪-১৫ মৌসুমে ২ হাজার ১০৪ মিলিমিটার, ২০১৫-১৬ মৌসুমে ১ হাজার ৭৬৯ মিলিমিটার, ২০১৬-১৭ মৌসুমে ১ হাজার ৩৯৬ মিলিমিটার, ২০১৭-১৮ মৌসুমে ২ হাজার ৫২৮ মিলিমিটার, ২০১৮-১৯ মৌসুমে ১ হাজার ৯৭২ মিলিমিটার, ২০১৯-২০ মৌসুমে ৩ হাজার ১৩৬ মিলিমিটার, ২০২০-২১ মৌসুমে ৩ হাজার ৮১ মিলিমিটার, ২০২১-২২ মৌসুমে ২ হাজার ৭১০ মিলিমিটার, ২০২২-২৩ মৌসুমে ১ হাজার ৭২২ মিলিমিটার এবং ২০২৩-২৪ মৌসুমে ১ হাজার ৯২৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলে অতিরিক্ত লবণাক্ততায় গাছপালা ও ফসলি জমির কী ধরনের ক্ষতি হতে পারে তা নিয়ে কথা হয় পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের হর্টিকালচার বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মাহবুব রব্বানীর সঙ্গে। তিনি বলেন, উপকূলে দুই ধরনের লবণাক্ততা– মাটিতে এবং পানিতে। এই লবণাক্ততা সহ্য ক্ষমতার বাইরে গেলে গাছপালা ও ফসলাদি লালচে হয়ে মরে যাবে। মূলত লবণাক্ততায় গাছের গোড়া বা মাটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে সবকিছুই নির্ভর করবে লবণাক্ততার পরিমাণ ও স্থায়িত্বের ওপর। যখন বৃষ্টি থাকবে না তখন লবণাক্ততা বেশি থাকবে এবং যখন বৃষ্টি থাকবে তখন লবণাক্ততা কমে যাবে। মাটি যেখানে যেভাবেই থাকুক একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ লবণ থাকতেই হবে। তা না থাকলে গাছ জন্মাবে না। আবার অতিরিক্ত লবণাক্ততাও কোনো কিছুর জন্য শুভকর নয়।
এই জলবায়ু বিশেষজ্ঞ বলেন, বেড়িবাঁধগুলো সংরক্ষণ করা এবং লবণাক্ত পানি ভিতরে ঢুকতে না পারে তাহলেই কৃষকরা জমির উর্বরতা ফিরে পাবে। এ ছাড়া উন্নয়নকাজের দোহাই দিয়ে রাস্তাঘাট-কালভার্ট ইত্যাদির মাধ্যমে অপরিকল্পিতভাবে জমি ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। তাহলেই এ অবস্থা থেকে উত্তরণ সম্ভব।
- বিষয় :
- ফসল
