ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

প্রতিশ্রুতিতে কেটে গেছে ৫৫ বছর, কেউ কথা রাখেননি

প্রতিশ্রুতিতে কেটে গেছে ৫৫ বছর, কেউ কথা রাখেননি
×

হাতীবান্ধা গ্রামের টেকিপাড়া বধ্যভূমি। মুক্তিযুদ্ধের সময় এখানে ১০ জনকে গুলি করে হত্যা করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী সমকাল

সখীপুর (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ৩১ মার্চ ২০২৬ | ০৭:৫২

| প্রিন্ট সংস্করণ

প্রতিশ্রুতিতে কেটে গেছে ৫৫ বছর। কেউ কথা রাখেননি। অরক্ষিতই রয়ে গেছে সখীপুর উপজেলার হাতীবান্ধা গ্রামের চারটি বধ্যভূমি। ফলে অযত্ন ও অবহেলায় নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে এসব বধ্যভূমি। কোনোটিতেই নেই সীমানা প্রাচীর, কোনোটিতে নেই পরিচিতি ফলক। কোথাও ধানক্ষেত, কোথাও ঝোপঝাড়। নদী-খালের পাড়ে পড়ে আছে অচিহ্নিত গণহত্যার স্থান। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারগুলোর দাবি, বধ্যভূমি সংরক্ষণ, একটি সম্মিলিত স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ এবং নিহতদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি।

স্বাধীনতার পর বহুবার সরকার এসেছে, জনপ্রতিনিধিরা দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু কেউ কথা রাখেননি। ১৯৯১ সালে নির্বাচিত সংসদ সদস্য হুমায়ুন খান পন্নী উদ্যোগ নেননি। ১৯৯৬ সালে নির্বাচিত সংসদ সদস্য বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তমও নীরব ছিলেন। ২০০৮ সালে নির্বাচিত সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা কৃষিবিদ শওকত মোমেন শাহজাহান উদ্যোগ নিয়েছিলেন, আলোচনাও করেছেন। কিন্তু কোনো ফল হয়নি। পরে অনুপম শাহজাহান জয় চেষ্টা চালিয়েও সফল হননি। ২০১৮ সালে এমপি জোয়াহেরুল ইসলামের প্রস্তাব ছিল, কিন্তু বাস্তবায়ন হয়নি। এটি সখীপুর উপজেলার হাতীবান্ধা গ্রামের করুণ চিত্র।
এবার সখীপুর-বাসাইল আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন অ্যাডভোকেট আহমেদ আযম খান। তিনি ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনেই মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন। এবার স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও উপজেলাবাসীর প্রত্যাশা– তাঁর নেতৃত্বেই বধ্যভূমিগুলো সংরক্ষণ ও শহীদদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি মিলবে।

বধ্যভূমিগুলো হচ্ছে টেকিপাড়া, কামালিয়াচালাখাল, কামালিয়াচালা বাজারের উত্তর পাশের জঙ্গল ও বংশাই নদীর মহিষডাঙ্গা। ১৯৭১ সালের ১৬ আগস্ট হাতীবান্ধা গ্রামের কামালিয়াচালা বাজার ঘেরাও করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। ওইদিন ছিল সোমবার। সময়টা বিকেল সাড়ে ৪টা থেকে ৫টা। হাট চলাকালে হানাদার বাহিনীর একটি দল মির্জাপুরের পাথরঘাটা, অন্যটি বাসাইল থেকে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে একযোগে ওই বাজারে আক্রমণ করে। ওইসময় তারা বাজারের ১০ ব্যবসায়ীকে আটক করে হাত-পা বেঁধে হাতীবান্ধা টেকিপাড়া জঙ্গলের পাশে কোমর পানিতে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করে। তাদের বাড়ি মির্জাপুর উপজেলার ছাওয়ালী গ্রামে। তারা হলেন মির্জাপুর উপজেলার মহেড়া ছাওয়ালী গ্রামের পাচু সাহার ছেলে প্রাণপ্রল্লব সাহা, মাদক বণিকের ছেলে মধু বণিক, কানাই বণিকের ছেলে গৌরচন্দ্র বণিক, বোরন সাহার ছেলে কৃষ্ণপদ সাহা, হারাধন সাহার ছেলে গৌরপদ সাহা ও অযুদ্ধা সাহা, যদু সাহার ছেলে গৌর শাহ, সুরেশ ঠাকুরের ছেলে তাপস, গৌর ঠাকুর ও যদু মোহন মণ্ডলের ছেলে খোকা মণ্ডল।
এর আগে ৫ আগস্ট দুই সহোদরসহ তিনজনকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে হাত-পা বেঁধে কামালিয়াচালা বাজারঘেঁষা খালের পানিতে নিক্ষেপ করা হয়। নেপাল চন্দ্র সরকার প্রাণে বেঁচে গেলেও তাঁর সহোদর নিতাই চন্দ্র ও চাচাতো ভাই পুণ্য চন্দ্র সরকার মারা যান। ২ আগস্ট তিনজনকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করে একই গ্রামের মহিষডাঙ্গা নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। তারা হলেন প্রভাত বাদ্যকর, তাঁর ছেলে হনু বাদ্যকর ও সোনাই বাদ্যকর। ১০ জুলাই কামালিয়াচালা বাজারের উত্তর পাশের জঙ্গলে আশ্রয় নেওয়া সরস্বতী মণ্ডল নামে বিধবা নারীকে গুলি করে হত্যা করে হানাদার বাহিনী।
প্রাণে বেঁচে যাওয়া নেপাল চন্দ্র সরকার জানান, হাত-পায়ের গিট্টু খুলে যাওয়ায় তিনি প্রাণে বাঁচলেও তাঁর ভাইকে বাঁচানো যায়নি। তাঁর চাচাতো ভাইও ওই খালের পানিতে মারা গেছেন। এই নির্মম দৃশ্য তাঁকে এখনও পীড়া দেয়। এরপরও তাঁর নাম মুক্তিযোদ্ধার তালিকাভুক্ত করা হয়নি।

প্রত্যক্ষদর্শী হাতীবান্ধা গ্রামের মহিষাডাঙ্গা এলাকার অনিল চন্দ্র দাসের ভাষ্য, নদীর এই স্থানটিতেই ৫ আগস্ট তাঁর স্বজন প্রভাত বাদ্যকর ও তাঁর দুই ছেলেকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করে নদীতে ফেলে দেয় হানাদার বাহিনী। সেই স্মৃতি শুধুই হৃদয়ে ধারণ করে রেখেছেন। আজও জায়গাটি সংরক্ষণ করা হয়নি।
হাতীবান্ধা গ্রামের বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা নরেশ চন্দ্র সরকার সমকালকে বলেন, চারটি বধ্যভূমি তাঁর বাড়ির চারপাশে। এলাকাটি মূলত সনাতন ধর্মাবলম্বী অধ্যুষিত নিরীহ এলাকা। মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রায় পুরো গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছিল হানাদার বাহিনী। চালানো হয়েছিল গণহত্যা। গ্রামের চারটি বধ্যভূমিই পরিত্যক্ত। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবেও অবহেলিত। বধ্যভূমি সংরক্ষণে অনেকেই কথা দিয়েছেন, কেউ কাজ করেননি। তাদের দাবি, বধ্যভূমিগুলো সংরক্ষণ করে স্মৃতিফলক নির্মাণ এবং যারা হানাদার বাহিনীর নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা গেছেন কিংবা প্রাণে বেঁচে গেছেন তাদের মুক্তিযোদ্ধার তালিকাভুক্ত করা।
উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের প্রশাসক ইউএনও আবদুল্লাহ আল রনীর ভাষ্য, তথ্য যাচাই-বাছাই করে দ্রুত স্মৃতিগুলো সংরক্ষণ করা হবে।
টাঙ্গাইল-৮ (সখীপুর-বাসাইল) আসনের সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী আহমেদ আযম খান বলেন, দ্রুত তদন্ত করে শহীদদের স্মৃতি রক্ষায় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

আরও পড়ুন

×