গোবিন্দগঞ্জ প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ
গোবিন্দগঞ্জ (গাইবান্ধা) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৪ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:৫৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) বিরুদ্ধে এডিপি, এলটিএম ও পিআইসি প্রকল্পের নামে-বেনামে প্রকল্প দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ ও অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে বিভিন্ন দপ্তরে একাধিক লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ওয়াজেদ আলী, মোস্তাকিম আহমেদ, অর্কিট সুলতান, মাকসুদুর রহমান ও আলমগীর সরকার নামের স্থানীয় বাসিন্দারা।
জানা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় উপজেলায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় গৃহীত ১০৯টি প্রকল্প অনুমোদন করে বাস্তবায়ন করা হয়। এর মধ্যে গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ (টিআর) ও পিআইসি কর্তৃক বাস্তবায়িত বেশ কিছু প্রকল্প নামমাত্র দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। এসব প্রকল্পের অনেকগুলোই উপজেলা পরিষদ উন্নয়ন তহবিল ব্যবহার নির্দেশিকা ও বিধিমালার পরিপন্থি।
১০৯টি প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে দুই কোটি ১৮ লাখ ৪২৮ টাকা। এর মধ্যে টেন্ডার পদ্ধতিতে (এলটিএম) চার কোটি ৬৪ লাখ এক হাজার ছয় টাকা এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) পদ্ধতিতে এক কোটি ছয় লক্ষাধিক টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়। এ ছাড়া এডিপির বিশেষ বরাদ্দের আরও ৬০ লাখ টাকায় ১২টি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি রাস্তা সংস্কারের কাজে উপজেলায় বরাদ্দ ১৭৫.৭৩৯৮ টন গমের অর্ধেক কাজও বাস্তবায়ন হয়নি।
উপজেলার সাপমারা ইউনিয়নের তরফকামাল শিয়ালগাড়া পশ্চিমপাড়া মসজিদ হতে তালেবের জমির অভিমুখে রাস্তা পুনর্নির্মাণ ও ড্রেন নির্মাণ বাবদ তিন লাখ ৯০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। একই ইউনিয়নের রামপুর মন্দির হতে আনারের বাড়ি অভিমুখে রাস্তায় ইটের সলিং ও রাস্তা পুনর্নির্মাণের জন্য ৫ দশমিক ৫০০ টন গম বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু সরেজমিন গিয়ে কোনো প্রকল্পের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি।
এ ছাড়া কাটাবাড়ী ইউনিয়নের হেলালপাড়া পাকা রাস্তা হতে ইটভাটা অভিমুখে রাস্তা সংস্কার ও ইটের সলিংকরণের জন্য পাঁচ টন গম বরাদ্দ দেওয়া হয়। একই ইউনিয়নে হামিদপুর পূর্বপাড়া হতে পশ্চিমে মসজিদ অভিমুখে রাস্তা সংস্কার ও ইটের সলিংকরণ বাবদ দুই লাখ টাকা বরাদ্দ হয়।
অপর একটি প্রকল্পের হামিদপুর পাড়া হতে উত্তর দিনাজপুর সীমানা অভিমুখে রাস্তা সংস্কার ও ইটের সলিংকরণের জন্য দুই লাখ টাকা বরাদ্দ হয়। সরেজমিন গিয়ে কাটাবাড়ী ইউনিয়নের এই তিনটি প্রকল্পের একটিরও কাজের কোনো অস্তিত্ব মেলেনি।
উপজেলার কামারদহ ইউনিয়নের চাঁদপাড়া মধ্যপাড়া সারাফাত মাস্টারের বাড়ী হতে ইউসুফ হুজুরের বাড়ী অভিমুখে ইটের সলিং ও রাস্তা পুনঃনির্মাণ এবং বেতগাড়া পূর্বপাড়া হেলার বাড়ী হতে রফিকুলের বাড়ির অভিমুখে রাস্তায় ইটের সলিং নির্মাণ ৬ লাখ ও রাস্তা পুনঃনির্মাণের জন্য ৪ লাখ টাকা বরাদ্দ হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইউপি সদস্য বলেন, ইউপি চেয়ারম্যান স্বেচ্ছাসেবকলীগ নেতা। তাই গ্রেপ্তার আতংকে চেয়ারম্যান পরিষদে আসেন না। প্রকল্পগুলো নামেই দিয়েছে পিআইও। কিন্তু এসব কাজের অস্তিত্ব নেই। এভাবেই কাজ না করে ১৭টি ইউনিয়নে বরাদ্দকৃত অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, পিআইসি কর্তৃক বাস্তবায়িত এসব প্রকল্পের অধিকাংশই নামকাওয়াস্তে। অর্থ লুটপাটের জন্যই কাগজে-কলমে এসব প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। আর নথিপত্রে প্রকল্পের বাস্তবায়ন দেখিয়ে বরাদ্দকৃত অর্থ ও গম আত্মসাৎ করা হয়েছে। এ নিয়ে উপজেলাজুড়ে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হলেও পিআইওর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পিআইওর এসব অনিয়ম-দুর্নীতি তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
উপজেলার সাপমারা ইউনিয়নের তরফকামাল শিয়ালগাড়া গ্রামের বাসিন্দা সরোয়ার হোসেন বলেন, নিয়ম অনুযায়ী কোনো ইউপি সদস্য সরকারি অর্থে ব্যক্তিগত কাজ করতে পারবে না। কিন্তু ইউপি সদস্য ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আবু তালেব প্রকল্পটি নিজের বাড়ীর রাস্তা দেখিয়ে প্রায় চার লাখ টাকা বিল উত্তোলন করেছেন। এ কাজে তাঁকে সহযোগিতা করেছেন পিআইও। প্রকল্পের কোনো কাজই করা হয়নি।
একই ইউনিয়নের রামপুর গ্রামের বাসিন্দা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, গ্রামের ওই প্রকল্পের কোনো অস্তিত্ব নেই। অর্থ আত্মসাৎ করার জন্য দেখানো হয়েছে। যা কাগজে কলমে আছে কিন্তু বাস্তবে নেই। তদন্ত সাপেক্ষ এসব অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে স্থানীয় আবু বক্কর নামে যুবক বলেন, প্রকল্পগুলোর কোনো কাজই বাস্তবায়ন করা হয়নি। সুষ্ঠু তদন্ত করলেই থলের বিড়াল বেড়িয়ে আসবে। অভিযোগের ভিত্তিতে একটি তদন্ত এসেছিল। কিন্তু সেখানে আমাদেরকে কোনো কথা বলার সুযোগ দেয়নি তদন্তকারী কর্মকর্তা।
অভিযোগকারী মোস্তাকিম আহমেদ, অর্কিট সুলতান ও আলমগীর সরকার বলেন, গত ৫ আগস্টের পর জনপ্রতিনিধিদের চেয়ে বেশি দুর্নীতি করেছে পিআইও। তাঁর অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ থেকে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে দেখা যায়নি।
সাপমারা ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান আবু তালেব বলেন, অর্থবছর শেষ হলেও সমস্যা নেই। তাঁর ইউনিয়নে নেওয়া প্রকল্পের কাজ আদায় করে নেবেন বলে জানান তিনি।
কামারদহ ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান সুলতান আহম্মেদ পিকু বলেন, এসব বিষয়ে উপজেলা প্রশাসন ভালো বলতে পারবে। পিআইওর অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে আপনারা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা জিন্দার আলী বলেন, ‘আপনারা (সাংবাদিকরা) এসব নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি কইরেন না। আপনাদের বিষয়টি দেখা হবে।’
এ ব্যাপারে ইউএনও সৈয়দা ইয়াসমিন সুলতানা বলেন, অভিযোগের বিষয়টি আমার জানা নেই। প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ পেলে আপনারা তথ্য সংগ্রহ করে নিউজ করেন। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দেখবেন।
- বিষয় :
- অনিয়ম
- অনিয়মের অভিযোগ
