ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

কচুরিপানার জটে অচল নৌপথ ফেরি আটকে পড়ায় ভোগান্তি

কচুরিপানার জটে অচল নৌপথ ফেরি আটকে পড়ায় ভোগান্তি
×

বাঞ্ছারামপুর উপজেলার কড়িকান্দি-আড়াইহাজারের বিষনন্দী নৌপথে কচুরিপানার জটলায় আটকে পড়া ফেরি উদ্ধারে অভিযান। ছবি: সমকাল

বাঞ্ছারামপুর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৬ এপ্রিল ২০২৬ | ১২:০২ | আপডেট: ০৬ এপ্রিল ২০২৬ | ১২:১৯

বাঞ্ছারামপুর উপজেলার কড়িকান্দি-আড়াইহাজারের বিষনন্দী ফেরিঘাটে কচুরিপানার জটলা তৈরি হওয়ায় নৌযান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে ঘাটের বাঞ্ছারামপুর অংশে কচুরিপানার বিশাল স্তূপ তৈরি হওয়ায় গতকাল রোববার সকাল থেকেই ফেরি পারাপারে ধীরগতি দেখা দেয়। দুপুর ১টা থেকে ৩টা পর্যন্ত মেঘনা নদীতে ফেরি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। নদীর পূর্বপাড়ে যাত্রী ও যানবাহন নিয়ে আটকা পড়ে একটি ফেরি। এতে বিপাকে পড়েন জরুরি প্রয়োজনে যাতায়াতকারীরা।

সরেজমিন দেখা যায়, বাঞ্ছারামপুরের কড়িকান্দি ও নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার বিষনন্দী ফেরিঘাট এলাকায় কচুরিপানার বিশাল স্তূপে আটকে পড়ে একটি ফেরি। রোববার দুপুর ১টার দিকে বাঞ্ছারামপুর-আড়াইহাজার নৌরুটে চলাচলরত ফেরিটি হঠাৎ নদীর বুকে ভাসমান কচুরিপানার ঘন জটলায় আটকে পড়ে। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে কচুরিপানার স্তূপ আরও ঘন হয়ে ওঠায় ফেরিটি সামনে কিংবা পেছনে কোনো দিকেই অগ্রসর হতে পারেনি।

ফেরি আটকে পড়ার খবরে দুই ঘাটেই যাত্রী ও যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। বিকল্প নৌযানের সংখ্যা সীমিত থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। বিশেষ করে অ্যাম্বুলেন্সসহ জরুরি সেবার যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। পরে আরেকটি ফেরি এসে কচুরিপানার জট অপসারণ করলে বিকেল ৩টার দিকে আবার ফেরি চলাচল শুরু হয়।

স্থানীয়রা জানান, কচুরিপানা ভেসে এসে নদীর ঘাট এলাকায় জমাট বেঁধেছে। এতে ফেরির প্রপেলার বারবার আটকে যাচ্ছে, ফলে পারাপারে সময় লাগছে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি। অন্যদিকে ছোট নৌকাগুলো চলাচল করতে না পেরে অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ রয়েছে, ফলে যাত্রীদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। এই ফেরিঘাটে কচুরিপানার জট শুধু সাময়িক ভোগান্তিই নয়; বরং স্থানীয় অর্থনীতি ও দৈনন্দিন জীবনে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।

ঘাটে অপেক্ষমাণ যাত্রী রাসেল মিয়া বলেন, ‘দুপুর থেকে দাঁড়িয়ে আছি, কিন্তু এখনও পার হতে পারিনি। কচুরিপানার কারণে ফেরি ঠিকমতো চলতে পারছে না। আমাদের সময় নষ্ট হচ্ছে, ভোগান্তি বাড়ছে।’

পণ্যবাহী গাড়ির চালক আলমগীর হোসেন জানান, আগে যেখানে নদী পার হতে ১০-১৫ মিনিট লাগত, সেখানে এখন এক থেকে দেড় ঘণ্টা লাগছে। এতে তাদের ট্রিপ কমে যাচ্ছে, আর্থিক ক্ষতিও হচ্ছে।

ফেরির একজন কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘কচুরিপানার জট খুব বেশি হয়ে গেছে। আমরা চেষ্টা করছি সরাতে, কিন্তু স্রোতের কারণে আবার এসে জমে যাচ্ছে। নিয়মিত পরিষ্কার না করলে এই সমস্যা কাটবে না।’

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এই ফেরিঘাটে কচুরিপানা অপসারণে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে মৌসুম এলেই এমন দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়।

নৌকার মাঝি শাহ আলম জানান, এই ঘাটে ২০-২৫টি নৌকা আছে। স্বাভাবিক অবস্থায় প্রতিদিন তিন-চারটি ট্রিপ পারাপার করতে পারেন, কিন্তু রোববার একটি ট্রিপও দিতে পারেননি তিনি। কচুরিপানার কারণে তার আগের নৌকাগুলো পার হতে পারেনি। এই জায়গাটা পার হতে প্রায় এক ঘণ্টা সময় লেগে যাচ্ছে। এতে যাত্রীরা ফেরিতে করে পার হচ্ছেন, এ কারণে কোনো ট্রিপ দিতে পারবেন কিনা তা নিয়ে গতকাল সংশয় প্রকাশ করেন তিনি।

ফরদাবাদ গ্রামের শাহীন মিয়া জানান, জরুরি কাজে ঢাকা যাবেন বলে বাড়ি থেকে রওনা হয়েছিলেন, কিন্তু কচুরিপানার জটের কারণে ফেরি পার হতে তিন ঘণ্টা চলে গেছে। কচুরিপানার ওপর দিয়ে মানুষ হাঁটতে পারছে, ভয়ংকর অবস্থা। গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে কচুরিপানার জট যাতে তৈরি না হয় সে ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়া উচিত ফেরি কর্তৃপক্ষের।

কানাইনগরের লিয়াকত জানান, ফেরিঘাটের পাশে নদীতে দেওয়া মাছের ঘেরগুলোর কারণে এই কচুরিপানার জটলা তৈরি হয়েছে। এতটা ভয়ংকর অবস্থা তৈরি হয়েছে যে, কচুরিপানার ওপর দিয়ে মানুষ হাঁটতে পারছে। এই কচুরিপানার জট বন্ধ করতে হলে অবৈধ ঘেরগুলো অপসারণ করতে হবে। এই ফেরিঘাট দিয়ে প্রতিদিন শত শত গাড়ি ও হাজারও যাত্রী যাতায়াত করে। গুরুত্বপূর্ণ এই ফেরিঘাটে পাশের কিছু ব্যক্তির স্বার্থের জন্য হাজারো মানুষ ভুক্তভোগী হবে এটি মেনে নেওয়া যায় না। অবিলম্বে ঘেরগুলো অপসারণের দাবি জানান তিনি।

ফেরিঘাটের ইজারাদারের প্রতিনিধি মাহবুবুর রহমানের ভাষ্য, আড়াই-তিন মাস ধরে ঘাটের পূর্বপাড়ে কচুরিপানা জমে আছে। রোববার দুপুরে বাতাসে পূর্বপাশের ঘাটে প্রচুর কচুরিপানা আটকে পড়ে। এতে নদীর মাঝখানে আটকে পড়ে ফেরি, পরে আরেকটি ফেরি গিয়ে কচুরিপানা অপসারণ করলে ৩টার দিকে ফেরি চলাচল শুরু হয়। কচুরিপানার কারণে ফেরি চলাচল ব্যাহত হচ্ছে, নদী পার হতে অনেক সময় লাগছে। এতে দুই পাশে যাত্রী ও যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হচ্ছে।

বাঞ্ছারামপুরে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী সিদ্দিকুর রহমান জানান, কচুরিপানার জটের কারণে রোববার কয়েক ঘণ্টা ফেরি চলাচল বন্ধ ছিল, পরবর্তীকালে কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে, তবে এখনও কচুরিপানা রয়েছে ঘাটের বাঞ্ছারামপুর অংশে। এই কচুরিপানাগুলো নরসিংদী এলাকা থেকে এসে দুই পাশে কিছু মাছের ঘের থাকার কারণে আটকে যায়। এই কচুরিপানার জট অপসারণে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আরও পড়ুন

×