ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

হাসপাতাল নিজেই যেন রোগী

হাসপাতাল নিজেই যেন রোগী
×

হাসপাতালের একটি আবাসিক ভবনের ভেতরে ছড়ানো-ছিটানো ময়লা-আবর্জনা সমকাল

এনামুল হক, সখীপুর (টাঙ্গাইল)

প্রকাশ: ১১ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:৩৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

সখীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি যেন নামেই ৫০ শয্যার হাসপাতাল। বিদ্যুৎ চলে গেলে কোনো বিকল্প নেই। নেই জেনারেটর অথবা আইপিএসের ব্যবস্থা। ফলে বিদ্যুৎ চলে গেলে অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে পুরো হাসপাতাল।

তিনটি আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন রয়েছে। যার সবগুলোই এক বছর ধরে অচল। একটিমাত্র পুরোনো এনালগ এক্স-রে মেশিন চালু থাকলেও সেটিতে নির্ভুল রোগ নির্ণয় হয় না। রয়েছে রোগীদের ওষুধ সংকট। কমপ্লেক্সের ভেতর চিকিৎসক ও কর্মচারীদের জন্য রয়েছে ছয়টি আবাসিক ভবন, যার সবকটিই ব্যবহার অনুপযোগী। ভবনের চারপাশ জঙ্গলঘেরা। অব্যবহৃত ভবনগুলোতে এখন সাপ-বিচ্ছুর অবাধ বিচরণ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ওয়ার্ডবয়, অফিস সহায়ক, আয়া ও বাবুর্চি পদে কর্মরত কোনো জনবল নেই। সবকটি পদই শূন্য। এ ছাড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক পদে ৬, স্বাস্থ্য সহকারী ২৫, অফিস সহকারী ৫, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ৩ ও একজন নিরাপত্তা প্রহরীর পদ শূন্য রয়েছে। আয়া বা পরিচ্ছন্নতাকর্মী না থাকায় অফিস কক্ষে বসার চেয়ার-টেবিল চিকিৎসকদেরই মুছতে হচ্ছে।
গাইনি বিভাগে চিকিৎসক রয়েছে একজন। তিনি সপ্তাহে অফিস করেন মাত্র দুই দিন। ফলে এই বিভাগের রোগীরা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ ছাড়া আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক রয়েছে একজন, তিনি রোগীদের আয়ুর্বেদিক চিকিৎসার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন অ্যালোপ্যাথিকে। ব্যবস্থাপত্রও লিখছেন। এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা তাঁকে বারবার সতর্ক করার পর অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ না লেখার জন্য লিখিত নির্দেশ দিয়েছেন। এমনই নাজুক পরিস্থিতিতে চলছে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি।

হাসপাতাল ঘিরে একটি দালাল চক্র দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় বলে অভিযোগ রয়েছে। হাসপাতালে আসা রোগীদের বিভিন্ন কৌশলে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠিয়ে দেন তারা। এই কাজে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কয়েকজন চিকিৎসক, উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকল অফিসার এবং হাসপতালঘেঁষা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কর্মচারীদের সহযোগিতার অভিযোগ রয়েছে। প্রতিকারের কোনো ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। ফলে চিকিৎসা নিতে আসা দরিদ্র রোগীরা সরকারি হাসপাতালে কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং তারা বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত টাকা ব্যয় করে বাইরে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
পরিচ্ছন্নতাকর্মীর অভাবে হাসপাতালজুড়ে ছড়িয়ে আছে ময়লা-আবর্জনা। আবর্জনার স্তূপ থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। হাসপাতালের পেছনে রয়েছে পরিত্যক্ত একটি ডোবা। বাড়ছে মশার উপদ্রব।
এই হাসপাতালে চিকিৎসকের ৩৫টি পদের বিপরীতে আছেন ২৯ জন। চিকিৎসক সংকট তুলনামূলক কম থাকলেও অবকাঠামোগত দুর্বলতা খুবই প্রকট। প্রয়োজনীয় কক্ষ না থাকায় প্রতিটি কক্ষে ৩-৪ জন চিকিৎসককে গাদাগাদি করে বসতে হচ্ছে। ফলে রোগীকে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারছেন না চিকিৎসকরা। ব্যাহত হচ্ছে সেবার মান। অন্যদিকে প্রতি ২৪ ঘণ্টায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিতে ভর্তি হচ্ছে কমপক্ষে ২৫-৩০ জন রোগী। বেশির ভাগ রোগী শয্যায় সিট না পেয়ে কক্ষের মেঝে ও বারান্দায় শুয়েই চিকিৎসা নিচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে হাসপাতালটির শয্যা সংখ্যা বাড়িয়ে অন্তত ১০০-তে উন্নীত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। হাসপাতালটিতে গত এক সপ্তাহ ঘুরে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

চিকিৎসা নিতে আসা অন্তঃসত্ত্বা আয়শা আক্তার জানান, তিনদিন হাসপাতালে এসেও গাইনি ডাক্তার না পেয়ে ক্লিনিকে গিয়ে তাঁকে সেবা নিতে হয়েছে।
গত বুধবার রোগী সালমা সুলতানা সমকালকে বলেন, ‘হাসপাতালে এসে ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন পেয়েছি মাত্র। কোনো ওষুধ পাইনি। বাইরে থেকে কিনতে হয়েছে।
সাবেক উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও সাবেক সিভিল সার্জন ডা. আনোয়ার হোসেনের ভাষ্য, আশপাশের ৩-৪টি উপজেলার রোগী এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাসেবা নিয়ে থাকেন। আরও আগে থেকেই হাসপাতালটি ১০০ শয্যা হওয়া দরকার ছিল। তিনি দ্রুত হাসপাতালটি ১০০ শয্যায় উন্নীত করার দাবি জানান।
জানতে চাইলে গাইনি চিকিৎসক কাজী আমরিন সমকালকে বলেন, ‘আমি নিয়ম মেনেই ছুটি নিই।’ এ ছাড়া আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।
আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক মাসুদ রানা তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের আংশিক সত্যতা স্বীকার করে আর কিছুই বলতে রাজি হননি।
উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা রেহানা পারভীন সমকালকে বলেন, আলট্রাসনোগ্রাম ও এক্স-রে মেশিনের বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে ডিজিটাল মেশিনের চাহিদা দেওয়া হয়েছে। সক্রিয় দালাল চক্রের বিষয়টি ক্লিনিক মালিক সমিতিকে সতর্ক করে লিখিত দেওয়া হয়েছে। পরবর্তীকালে সত্যতা প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গাইনি চিকিৎসক বিনা অনুমতিতে অনুপস্থিত থাকায় তাঁকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। আয়ুর্বেদিক চিকিৎসককেও নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।

আরও পড়ুন

×