হেলায় পড়ে থাকা মাছের আঁশ এখন আয়ের উৎস
রাজারহাটের মাঝিপাড়া এলাকায় মাছের আঁশ শুকিয়ে সংগ্রহ করছেন এক নারী সমকাল
কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১১ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:৫৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
একসময় যা ছিল পচা বর্জ্য, অবহেলায় পড়ে থাকত বাজারের নর্দমায়, সেই মাছের আঁশই এখন কুড়িগ্রামের মানুষের কাছে আশীর্বাদ হয়ে ধরা দিয়েছে। অবহেলিত এই আঁশ এখন আর নর্দমার আবর্জনা নয়, বরং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের এক নতুন দিগন্ত। কুড়িগ্রামের নদনদী আর জলাশয়ের রূপালি মৎস্যের সেই উচ্ছিষ্ট অংশ এখন ‘কোলাজেন’ হয়ে পাড়ি জমাচ্ছে জাপান, চীন ও ইউরোপের অভিজাত বাজারে।
কুড়িগ্রামের বিভিন্ন বাজারে এখন আর মাছের আঁশ কিংবা নাড়িভুঁড়ি ফেলে দেওয়া হয় না। রুই, কাতলা, মৃগেল কিংবা ইলিশের ঝকঝকে আঁশগুলো পরম মমতায় সংগ্রহ করেন শ্রমিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। সংগৃহীত এই আঁশগুলো প্রথমে সাধারণ পানিতে এবং পরে গরম পানিতে ধুয়ে ধবধবে পরিষ্কার করা হয়। এর পর রোদে শুকিয়ে ঝরঝরে রূপালি চাকতিতে পরিণত করে তা তুলে দেওয়া হয় পাইকারের হাতে। প্রতিমণ শুকনো আঁশ এখন বাজারে দুই থেকে চার হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা প্রান্তিক মানুষের জীবনে নিয়ে এসেছে অভাবনীয় সচ্ছলতা।
কেন এই আঁশের এত কদর? বিজ্ঞানীরা বলছেন, মাছের আঁশে রয়েছে প্রচুর পরিমাণ ‘কোলাজেন’, যা দিয়ে তৈরি হয় জীবন রক্ষাকারী ওষুধের ক্যাপসুল, উন্নতমানের কসমেটিকস, ফুড সাপ্লিমেন্ট এমনকি কৃত্রিম কর্নিয়া। শুধু তাই নয়, আধুনিক প্রযুক্তিতে ব্যাটারি তৈরি, রিচার্জেবল ব্যাটারি এবং পোলট্রি খাদ্য হিসেবেও এর ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। এই বহুমুখী ব্যবহারের কারণেই ফেলে দেওয়া আঁশ এখন কুড়িগ্রামের ঘরে ঘরে কর্মসংস্থান আর আয়ের উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজারহাট উপজেলার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী দিলীপ কুমার বলেন, ‘দীর্ঘদিন মাছের ব্যবসা করলেও আঁশ যে টাকা দেয়, তা জানতাম না। আগে এগুলো ফেলে দিতাম। এখন প্রশিক্ষণ নিয়ে এগুলো শুকিয়ে বছরে দুই-তিনবার বড় পাইকারের কাছে বিক্রি করি। এতে আমাদের বাড়তি আয় হচ্ছে।’
শহরের খলিলগঞ্জ বাজারের পূর্ণ চন্দ্র দাস বলেন, ‘শুধু আঁশ নয়, মাছের নাড়িভুঁড়ি, পাখনা এমনকি পেটের বেলুনও এখন বিক্রি হয়। আগে যা দুর্গন্ধ ছড়াত, এখন তা আমাদের পকেটে টাকা দিচ্ছে।’ মাছ কাটা শ্রমিক সজীবের কণ্ঠেও আনন্দের সুর; দিনে কয়েক মণ মাছ কেটে এখন আর আঁশ ফেলে দেন না তিনি, দিন শেষে এই উচ্ছিষ্ট বিক্রি করেই মেলে বাড়তি পারিশ্রমিক।
কুড়িগ্রাম জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম আকন্দ বলেন, ‘মাছের আঁশ এখন বিশ্বজুড়ে এক পরিবেশবান্ধব কাঁচামাল। রাসায়নিক শিল্পে এর ব্যাপক চাহিদা থাকায় এই খাতটি দ্রুত ক্ষুদ্র থেকে মাঝারি শিল্পে পরিণত হচ্ছে। আমরা এর গুণগত মান বজায় রাখতে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের পরামর্শ ও সহযোগিতা দিচ্ছি।’
কুড়িগ্রামের এই রূপালি বিপ্লব প্রমাণ করেছে, সঠিক দৃষ্টি আর পরিশ্রম থাকলে বর্জ্যকেও সম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব। নর্দমা থেকে বিদেশে– মাছের আঁশের এই যাত্রা উত্তরবঙ্গের এই জনপদে এক নতুন অর্থনৈতিক কাব্য রচনা করছে।
- বিষয় :
- আয়ের পথ
