ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

দিনে দুবার বর্জ্য পড়ে ছোট যমুনায়

দিনে দুবার বর্জ্য পড়ে ছোট যমুনায়
×

ফুলবাড়ী দিয়ে প্রবাহিত ছোট যমুনা নদী বছরের প্রায় সময় নদীটি পানিশূন্য থাকে। বুধবার পৌর এলাকা থেকে তোলা সমকাল

আজিজুল হক সরকার, ফুলবাড়ী (দিনাজপুর)

প্রকাশ: ১২ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:২৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

দিনাজপুরের ফুলবাড়ী দিয়ে প্রবাহিত এক সময়ের খরস্রোতা ছোট যমুনা নদী এখন মৃতপ্রায়। বছরের অধিকাংশ সময় নদীতে পানি থাকে না। যেখানে সামান্য পানি আছে সেখানেও জমছে ময়লা-আবর্জনা। স্থানীয়রা জানান, পৌরসভার পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা দিনে দুবার নদীর দুটি স্থানে বর্জ্য ফেলছেন। এর বাইরে রয়েছে নির্বিচারে নদীর তীর দখল। নদীটিকে রক্ষায় প্রশাসনের অবহেলার অভিযোগও করছেন স্থানীয়রা। ছোট যমুনাকে বাঁচাতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি ফুলবাড়ীর সচেতন নাগরিকদের।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ফুলবাড়ী পৌরসভার স্থায়ী বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না থাকায় প্রতিদিনের ময়লা নদীর বিভিন্ন স্থানে ফেলা হচ্ছে। এতে নদীর তলদেশে আবর্জনার স্তূপ জমে ভরে উঠছে। এতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও পরিবেশ মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
স্থানীয় প্রবীণরা জানান, কয়েক দশক আগেও ছোট যমুনা নদী ছিল এ অঞ্চলের প্রাণ। বর্ষা মৌসুমে নদী ভরে উঠত পানিতে। শুষ্ক মৌসুমেও নদীতে নৌকা চলাচল করত। নদীর পানি ব্যবহার হতো কৃষিকাজ, মাছ ধরা ও গৃহস্থালির নানা কাজে। এ নদী ঘিরেই গড়ে উঠেছিল এলাকার অর্থনীতি ও জীবনযাত্রা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নদীর নাব্য কমে গেছে। পলি জমে নদীর অনেক অংশ ভরাট হয়ে গেছে এবং বিভিন্ন স্থানে অবৈধ দখল ও অব্যবস্থাপনার কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
এক সময় খরস্রোতা হিসেবে পরিচিত এই নদী বর্তমানে অনেকাংশেই মরা খালে পরিণত। নদীর নাব্য কমে যাওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে নদীর তীর দখল করে অবৈধ স্থাপনা গড়ে ওঠায় নদীটি দিন দিন সরু হয়ে যাচ্ছে। এর ওপর যুক্ত হয়েছে দূষণের সমস্যা। 

সম্প্রতি সরেজমিন দেখা যায়, দিনাজপুর-ফুলবাড়ী-ঢাকা আঞ্চলিক মহাসড়কের ফুলবাড়ী পৌর এলাকার বড় ব্রিজের (জোড়া ব্রিজ) নিচে এবং পৌর বাজার-সংলগ্ন ফুট ওভারব্রিজের পাশে নিয়মিত পৌরসভা এলাকার বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা প্রতিদিন দুবার এসব বর্জ্য নদীতে ফেলেন। তিন-চার বছর আগে স্বল্প পরিসরে বর্জ্য ফেলা শুরু হলেও বর্তমানে পৌরসভা এলাকার অধিকাংশ বর্জ্য এখানেই ফেলা হচ্ছে। গৃহস্থালি বর্জ্যের পাশাপাশি কাঁচাবাজারের ময়লাও নিয়মিত নদীতে ফেলা হচ্ছে। এসব ময়লা-আবর্জনা নদীর পাড়ে জমে থেকে দুর্গন্ধ সৃষ্টি করছে এবং পানিকে আরও দূষিত করে তুলছে। এতে নদীর পরিবেশ যেমন নষ্ট হচ্ছে, তেমনি আশপাশের বাসিন্দারাও নানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন।
পরিবেশবিদরা বলছেন, নদী শুধু একটি জলধারা নয়; একটি অঞ্চলের পরিবেশ, কৃষি, জীববৈচিত্র্য এবং মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। তাই ছোট যমুনা নদীকে বাঁচাতে পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। অন্যথায় অবহেলা ও দূষণের কারণে একসময় এই নদী পুরোপুরি বিলীন হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
ফুলবাড়ী সম্মিলিত সচেতন নাগরিক সমাজের সভাপতি হামিদুল হক বলেন, নদীটি দ্রুত খনন করে নাব্য ফিরিয়ে আনতে হবে। নইলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে হারিয়ে যাবে এ নদীর অস্তিত্ব। তিনি নদীতে বর্জ্য ফেলা বন্ধেরও দাবি জানান।

ছোট যমুনার উৎপত্তি দিনাজপুর জেলার চিরিরবন্দর উপজেলার বিন্যাকুড়ি এলাকার ইছামতী নদী থেকে। সেখান থেকে নদীটি পার্বতীপুর উপজেলার হাবড়া ইউনিয়ন হয়ে ফুলবাড়ী দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বিরামপুর উপজেলার কাটলা সীমান্ত ঘেঁষে হাকিমপুরের হিলি সীমান্ত এলাকায় প্রবেশ করেছে। এরপর ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার কিছু অংশ দিয়ে আবার বাংলাদেশে প্রবেশ করে জয়পুরহাট জেলার সদর ও পাঁচবিবি উপজেলা অতিক্রম করে নওগাঁর আত্রাই উপজেলার ত্রিমোহনী এলাকায় যমুনা ও আত্রাই নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। নদীটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৫৬ কিলোমিটার। ফুলবাড়ী অংশে নদীর প্রস্থ প্রায় ১০৫ মিটার এবং গড় গভীরতা প্রায় ৬ মিটার। নদী অববাহিকার আয়তন প্রায় ১৬০ বর্গকিলোমিটার। 
দিনাজপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী ফারুক আহমেদ বলেন, নদীদূষণ কোনোভাবেই কাম্য নয়। ছোট যমুনার দূষণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। প্রয়োজনে ফুলবাড়ী পৌরসভাকে অবহিত করা হবে। তা না হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ফুলবাড়ী পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী লুৎফুল হুদা চৌধুরী বলেন, জাইকা প্রকল্পের মাধ্যমে পৌরসভার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য প্রায় দেড় কোটি টাকা বরাদ্দ এসেছিল। তবে জমি অধিগ্রহণে জটিলতার কারণে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় বরাদ্দ ফেরত চলে যায়। তিনি বলেন, নদীতে পৌরসভা থেকে কোনো ধরনের বর্জ্য ফেলা হচ্ছে না। তবে জনসাধারণ ফেলতে পারে, তা আমার জানা নেই। 
ফুলবাড়ী পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) সামিউল ইসলাম বলেন, নদীতে পৌরসভার বর্জ্য ফেলার বিষয়টি তাঁর জানা নেই। খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

আরও পড়ুন

×