অভিজ্ঞ ধাত্রীর ওপর ভরসা রাখেন মাম্যাচিং মারমা
ঘুমন্ত কন্যার পাশে সুমন চাকমা ও মাম্যাচিং মারমা। ছবি : সমকাল
বান্দরবান প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬ | ১৮:১৪
সকাল থেকে আমার স্ত্রী মাম্যাচিং মারমার হালকা হালকা প্রসব ব্যথা ওঠে। রাত ৮টার দিকে ব্যথা আরও বেড়ে যায়। গাড়ি ডেকে সদর হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করি। আমার স্ত্রীসহ তার ফুফিরা হাসপাতালে নিতে রাজি নন। তারা ধাত্রী হামিদা বেগমের কাছে নিয়ে যেতে বলেন। তারা ধাত্রী হামিদাকে বেশি বিশ্বাস করেন। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য তাদের অনেক বুঝিয়েছি।
শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়েছি শহরের উজানী পাড়া এলাকার ধাত্রী হামিদার বাসায় নিয়ে যেতে। টেনশনে মাথায় কাজ করছিল না কী থেকে না জানি কী হয়ে যায়। কথাগুলো বলছিলেন নববর্ষের রাতে জন্ম নেওয়া কন্যাশিশুটির বাবা সুমন চাকমা।
প্রথম সন্তান হওয়ার সময় স্ত্রীর পাশে থাকতে পারেননি তিনি। দ্বিতীয় সন্তানের সময় অফিস থেকে ছুটি নিয়ে স্ত্রীর পাশে থাকার চেষ্টা করেছেন। সন্তান জন্মের সময় মেয়েদের এত যে যন্ত্রণা হয় এই প্রথম কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা হয়েছে, বললেন শিশুটির বাবা।
বাংলা নববর্ষ উদযাপনের প্রস্তুতিতে সবাই যখন মাতোয়ারা সেই সময় স্ত্রীকে নিয়ে ব্যস্ত সুমন চাকমা। এদিন রাতে সুমনের দ্বিতীয় কন্যাসন্তানের জন্ম হয়। রাত ১টা ২৯ মিনিটে শহরে উজানি পাড়া এলাকা ধাত্রী হামিদা বেগমের বাসায় জন্ম নেয় ফুটফুটে কন্যাসন্তান। জন্মের সময় বাচ্চাটির ওজন ছিল ৩ কেজি ৬০০ গ্রাম। মা ও নবজাতক দুইজনেই এখন সুস্থ। প্রথম কন্যাসন্তানের বয়স ৫ বছর ২ মাস। নাম ডম্যা।
সুমন চাকমা এমএসএস পাস করে ব্র্যাকের ক্রেডিট প্রোগ্রামে চাকরি করছেন। কর্মস্থল বান্দরবান জেলার আলীকদম উপজেলায়। মাম্যাচিং মারমার সঙ্গে ২০১৫ সালে বিয়ে হয়।
মাম্যাচিং মারমা বলেন, আমার আত্মীয়- স্বজনেরাও অভিজ্ঞ ধাত্রী হামিদা বেগমের কাছে অনেক সন্তান জন্ম দিয়েছেন। আমার প্রথম কন্যাসন্তানও হামিদার হাতেই স্বভাবিকভাবে জন্ম নিয়েছে। তিনি আরও বলেন, গভীর রাতে সন্তানের জন্ম দেওয়ার পর বাচ্চাটাকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারিনি। ক্ষিধের জ্বালায় অনবরত কান্না করছিল। আজ সকাল সাড়ে ৭টায় বাসায় ফিরে প্রথমে স্নান করে নিই। এরপর ভগবানের কাছে প্রার্থনা করি যাতে আমার বাচ্চাটাকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারি। প্রার্থনার পর ডাল, লাউ ভাজি দিয়ে ভাত খাই। এরপর সকাল সাড়ে ৮টার দিকে দেখি বুকের কাপড়ে ভেজা ভেজা ভাব। আমার সোনামনিকে বুকের দুধ খাওয়াতে পেরে অনেক শান্তি লেগেছে। বিষয়টি বলে বোঝাতে পারব না।
মাম্যাচিংয়ের ফুফু লিলিম্যা মারমা ও আমুই মারমা বলেন, আমাদের সন্তানরাও অভিজ্ঞ ধাত্রী হামিদার হাতেই জন্ম নিয়েছে। তার ওপর আমাদের ভরসা ছিল। কন্যাশিশুটির দাদু মংসাইচা মারমা বলেন, আমাদের মারমা বৌদ্ধ ধর্মীয় নিয়মে ১৩ এপ্রিল দিনটি শুভ ও পবিত্র একটি দিন। এই দিনে নাতনিটার জন্ম হলে ভালো হতো। এরপরও আমরা খুশি বাংলা নববর্ষের দিন রাতে হয়েছে।
ধাত্রী হামিদা বেগম বলেন, আমি এফডব্লিউভি। ইওসিও ধাত্রী বিদ্যা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। আল্লাহর মেহেরবানিতে এখন পর্যন্ত কোনো নবজাতক ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। মাম্যাচিং মারমা গর্ভধারণের পর থেকেই আমার সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখেছে।
নবজাতক শিশুটির বাবা সুমন চাকমা বলেন, আজ মঙ্গলবার সকালে মেয়েকে বাসায় নিয়ে আসার পর শ্বশুরবাড়ির লোকজন আশীর্বাদ দিতে এসেছেন। সন্ধ্যায় আমার বাবা-মা ও আত্মীয়রা মেয়েকে দেখতে আসার কথা। মেয়ের নাম এখনো রাখা হয়নি। আদর করে মামুনি ডাকি। আমাদের দুই কন্যাসন্তান যেন উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে মানুষের মতো মানুষ হয়ে পরিবারের ও দেশের মুখ উজ্জ্বল করে।
- বিষয় :
- বান্দরবান
