ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

তিস্তার ভাঙনে নেই টেকসই সমাধান

তিস্তার ভাঙনে নেই টেকসই সমাধান
×

সুন্দরগঞ্জের কাপাসিয়া ইউনিয়নের ভোরের পাখি গ্রামে ভাঙন হুমকিতে ফসলের ক্ষেত সমকাল

সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৮ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:১৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে উজান এলাকায় তিস্তার ভাঙন চলছেই। প্রতিবছর ঘরবাড়ি, ফসলি জমিসহ সবকিছু হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হচ্ছে হাজারো মানুষ। স্কুল ভবন নদীতে চলে যাওয়ায় অকালে ঝরে পড়ছে বহু শিক্ষার্থী। সরকারের সঠিক পরিকল্পনার অভাবে যুগের পর যুগ প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে যুদ্ধ করে যাচ্ছেন এ অঞ্চলের মানুষ। এ বছরও তিস্তার ভাঙন প্রকট আকার ধারণ করেছে। ভাঙনের তথ্য নিয়মিত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানালেও ব্যবস্থা নেওয়া হয় না বলে আক্ষেপ করেছেন স্থানীয়রা। 

উপজেলার কাপাসিয়া ইউনিয়নের উজান এলাকায় তীব্র নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে শতাধিক একর ফসলি জমি, বসতবাড়ি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হুমকির মুখে পড়েছে। ভোরের পাখি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। অসময়ে ভাঙনে চরের মানুষ উঠতি ফসল হারানোর আশঙ্কায় চরম দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।
স্থানীয়রা জানান, যে কোনো সময় বসতভিটা নদীতে বিলীন হওয়ার আশঙ্কায় দিশেহারা চরবাসী। কাপাসিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘সারা বছরই নদী ভাঙছে। জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ফেলা হলেও তাতে কার্যকরভাবে ভাঙন রোধ হচ্ছে না। স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন।’

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস ও কৃষি অধিদপ্তরের তথ্যমতে, তারাপুর, বেলকা, হরিপুর, চণ্ডীপুর, শ্রীপুর ও কাপাসিয়া ইউনিয়নের ওপর দিয়ে প্রবাহিত তিস্তা নদীর ভাঙনে ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৪৫০টি বসতভিটা, ৩০০ হেক্টর ফসলি জমি, রাস্তাঘাট ও বিভিন্ন স্থাপনা বিলীন হচ্ছে। গত পাঁচ বছরে আড়াই হাজার বসতভিটা, এক হাজার ৫০০ হেক্টর জমি, ৫০ কিলোমিটার রাস্তাঘাট, ৩০টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও ১০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিলীন হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ভাঙনকবলিত পরিবারগুলোর জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে ত্রাণ বিতরণ ছাড়া কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
হরিপুর ইউনিয়নের ডাঙ্গার চর গ্রামের বাসিন্দা জরিফ মিয়া বলেন, ‘চরের প্রতিটি মানুষ পাঁচ থেকে আটবার পর্যন্ত ভাঙনের শিকার হয়েছে। গত ১০ বছর ধরে সারা বছর ভাঙন চলছে। জিও ব্যাগ ফেলা হলেও তাতে কোনো উপকার হচ্ছে না।’

হরিপুরের কাশিম বাজার বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক আ. ব. ম. আব্দুল ওয়াহেদ সরকার বলেন, ‘উজানের পলি জমে নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় তিস্তার গতিপথ পরিবর্তন হয়েছে। ফলে নদী অসংখ্য শাখায় বিভক্ত হয়ে ভাঙন বাড়াচ্ছে। স্থায়ীভাবে ভাঙন রোধ না করলে চরের মানুষের দুর্ভোগ কমবে না।’
কাপাসিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মঞ্জু মিয়া বলেন, ‘পানি কমলে উজানে আর পানি বাড়লে ভাটিতে ভাঙন দেখা দেয়। বর্তমানে উজানে ভাঙন চলছে। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সংগঠন ও জনপ্রতিনিধিরা দাবি জানালেও এখন পর্যন্ত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ভাঙনকবলিত পরিবারগুলোর দুর্ভোগ চরমে।’
কাপাসিয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও বিএনপির সাবেক উপজেলা সভাপতি মো. মোজাহারুল ইসলাম বলেন, ‘নদী খনন ও শাসন ছাড়া তিস্তার ভাঙন রোধ সম্ভব নয়। জিও ব্যাগ-জিও টিউব এখন আর কার্যকর নয়। দ্রুত স্থায়ী ব্যবস্থা না নিলে উপজেলার মানচিত্রই বদলে যাবে।’

কৃষি কর্মকর্তা রাশিদুল কবির বলেন, ‘তিস্তার চরাঞ্চল কৃষির জন্য সম্ভাবনাময় এলাকা। কিন্তু প্রতিবছরের ভাঙনে কৃষকদের স্বপ্ন ভেঙে যাচ্ছে। বছরে প্রায় ৩০০ হেক্টর জমি নদীতে বিলীন হচ্ছে। স্থায়ী সমাধান হলে কৃষকরা স্বাবলম্বী হতে পারবেন।’
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মশিয়ার রহমান বলেন, ‘উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের ওপর দিয়ে তিস্তা প্রবাহিত। প্রতিবছর ৪০০ বসতভিটা ও ৩০০ হেক্টর জমি নদীতে বিলীন হয়। এ-সংক্রান্ত তথ্য নিয়মিত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে পাঠানো হয়।’
গাইবান্ধা পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হাফিজুল হক বলেন, ‘স্থায়ী ভাঙন রোধের বিষয়টি সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে। আমরা ভাঙন দেখা দিলে জিও টিউব ও জিও ব্যাগ ফেলার পাশাপাশি তথ্য প্রেরণ করে থাকি। নদী খনন ও শাসন ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।’
 

আরও পড়ুন

×