সৈকতের সংগ্রাম
১৫ বছরের মৃত্যুভয় পেরিয়ে নতুন জীবন
হাসপাতালে চিকিৎসকের চেম্বারের সামনে মায়ের সঙ্গে সৈকত খান। সম্প্রতি ফলোআপ চিকিৎসার জন্য আসেন তিনি। ছবি-সমকাল
শিলু হোসেন
প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৬ | ২২:০২ | আপডেট: ২০ এপ্রিল ২০২৬ | ০০:০৯
সৈকত খানের বয়স তখন সাত বছর। এই বয়সে বন্ধুদের সঙ্গে হেসে-খেলে দিন কাটানোর কথা। কিন্তু সৈকতের শৈশব ছিল ভিন্ন। প্রায়ই জ্বর আসত। একটু দৌড়ালেই হাঁপিয়ে উঠত, পা ফুলে যেত, কিছুক্ষণ বসে থাকলে আর দাঁড়াতে পারত না। খেলাধুলার পর্ব তার শিশুকালে ছিল না বললেই চলে।
এর মধ্যে হঠাৎ একদিন নতুন ভয় জেঁকে বসল। বুকের ভেতর সারাক্ষণ ‘টিকটিক’ শব্দ করে, যেন অদৃশ্য কোনো ঘড়ি বেজে চলেছে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই শব্দও জোরালো হতে থাকে। অজানা আতঙ্কে কেঁপে উঠত ছোট্ট সৈকত। বিভিন্ন হাসপাতালে ঘুরে অবশেষে জানা গেল, তার হার্টের একটি ভালভ নষ্ট। সেই মুহূর্ত থেকেই শুরু অন্যরকম সংগ্রাম।
মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার শায়েস্তা ইউনিয়নের মোসলেমাবাদ গ্রামে সৈকতের বাড়ি। তিন ভাইয়ের মধ্যে সে ছোট। তার জন্ম ২০০৪ সালে। সংসারের ভার ভাগ করে নিতে শিশুকালে তাকে নানা-নানির কাছে রেখে বিদেশে পাড়ি জমান মা খাদিজা খাতুন। বাবা ব্যস্ত থাকতেন কৃষিকাজে। স্থানীয় চিকিৎসকের পরামর্শে সাত বছর বয়সী সৈকতকে নেওয়া হয় রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে প্রথমে ধরা পড়ে বাতজ্বর। চিকিৎসা নিয়ে কিছুটা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও বুকের ‘টিকটিক’ শব্দ আর থামেনি। এই শব্দ আর মৃত্যুভয়কে সঙ্গী করেই কেটে গেছে প্রায় ১৫ বছর।
ভয়াবহ সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়লে এখনও শিউরে ওঠেন ২২ বছর বয়সী সৈকত। তিনি বলেন, ‘আমার অসুস্থতার কারণে মা বেশি দিন বিদেশে থাকতে পারেননি। ২০১৫ সালে দেশে ফিরেই আমাকে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নিয়ে যান। পরীক্ষায় হার্টের ভালভে সমস্যা ধরা পড়ে। ডাক্তার বললেন, দ্রুত অপারেশন করতে হবে। কিন্তু তারা এত বড় অপারেশনের ঝুঁকি নিতে পারবেন না। ডাক্তার জানালেন, ভারতের মাদ্রাজে করাতে পারলে ভালো; খরচ পড়বে সাত থেকে আট লাখ টাকা।’
এত বড় অঙ্কের খরচ শুনে দিশেহারা হয়ে পড়েন খাদিজা খাতুন। বিদেশে বেশিদিন কাজ করতে না পারায় সঞ্চয়ও তেমন ছিল না। টাকার অভাবে দীর্ঘদিন চিকিৎসা বন্ধ থাকে। বাড়তে থাকে বুকের ভেতরের সেই শব্দ। সৈকত বলেন, ‘মাঝে মাঝে এত শব্দ হতো, মনে হতো বুকটা ফেটে যাবে!’

২০২৫ সালের শুরুতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে ওঠে। খাবারে অরুচি, জোর করে খেলেও বমি– শেষ পর্যন্ত একেবারে বিছানায় পড়ে যান সৈকত। একটি প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে কিছুদিন ভালো থাকলেও আবার অসুস্থ হয়ে পড়তেন। তবুও ভেঙে পড়েননি। ২০১৮ সাল থেকে মোবাইল ফোনে ছোট ছোট ভিডিও বানিয়ে ফেসবুকে পোস্ট করতেন সৈকত। তার ভাষ্য, এটা ছিল নিজেকে একটু ভালো রাখার চেষ্টা।
তিনি জানান, একদিন বিছানায় শুয়ে ভিডিও দেখতে দেখতে হঠাৎ সামনে আসে ডা. লোকমান হোসেনের একটি সাক্ষাৎকার। রাজধানীর ল্যাবএইড কার্ডিয়াক হাসপাতালের কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগের এই সিনিয়র কনসালট্যান্ট ও সার্জনের কথা শুনে নতুন করে আশার আলো দেখেন সৈকত। ঠিকানা খুঁজে ওই বছরের নভেম্বরেই পৌঁছে যান তাঁর চেম্বারে। সব কথা শুনে ডা. লোকমান তাঁকে সাহস দেন। শুরু হয় চিকিৎসার নতুন অধ্যায়। অস্ত্রোপচারের খরচ জোগাতে বসতভিটাও বিক্রি করে দেন মা খাদিজা। পাশে দাঁড়ান বন্ধু-স্বজন, প্রতিবেশী। সেই নভেম্বরেই অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর অনেকটাই সুস্থ সৈকত। বুকের ভেতর শব্দ এখনও হয়; তবে কম।
সৈকতের বিষয়ে জানতে ডা. লোকমান হোসেনের সঙ্গে কথা হয়। তিনি সমকালকে বলেন, হার্টে ভালভ থাকে চারটি; সৈকতের একটি নষ্ট ছিল। বিভিন্ন হাসপাতালে ঘুরে অনেক দেরি করে আমার কাছে আসে। এ কারণে ঝুঁকি ছিল বেশি। তার শরীরে মেটালিক ভালভ প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। যতদিন বেঁচে থাকবে, ততদিন এটি কাজ করবে। ঘুমানোর সময় এই ভালভ থেকে একটু শব্দ আসে; রোগীকে তা মানিয়ে নিতে হয়।
ডা. লোকমান হোসেন বলেন, যে কোনো বয়সেই হার্টের ভালভের সমস্যা হতে পারে। যথাসময়ে ঠিকমতো চিকিৎসা পেলে এই সমস্যা সমাধান সম্ভব। দেরি হলে জটিলতা বাড়ে। আমাদের দেশে জন্মগতভাবে এই রোগ নিয়ে শতকরা ১ শতাংশ শিশু ভূমিষ্ঠ হয়। গর্ভে থাকা অবস্থায় চিকিৎসার সুযোগ নেই।
বর্তমানে ভাড়া বাসায় থাকে সৈকতের পরিবার। পড়াশোনা করার প্রবল ইচ্ছা থাকলেও অসুস্থতার কারণে প্রাথমিকের গণ্ডি পেরোতে পারেননি তিনি। তবে জীবন থেমে থাকেনি। গত মার্চ মাসে বিয়ে করেছেন সৈকত। ছোট পরিসরে অনলাইনে শুরু করেছেন কাপড়ের ব্যবসা। গ্রামে দেওয়া সেই দোকানের নাম ‘জেন-জি’।
সৈকত বলেন, ‘এত সুন্দর জীবন আমি বোনাস হিসেবে ফিরে পেয়েছি, সেটা হাসিখুশিতে কাটাতে চাই। স্বপ্ন দেখি, একদিন জমি কিনে নিজের একটা বাড়ি করব– পরিবার নিয়ে খুব সুখে থাকব।’
