এনজিও ঋণের ফাঁদে বিপর্যস্ত পরিবার, বাড়ছে আত্মহত্যা
সনি আজাদ, চারঘাট (রাজশাহী)
প্রকাশ: ২১ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:২৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
ভোরের আলো ফোটার আগেই ঘুম ভাঙে আঙ্গুরা বেগমের। গাভিকে খাবার দিয়ে বসেন পুরোনো এক খাতার সামনে; যেখানে শুধু ঋণের হিসাব। সেই হিসাব কোনোদিনই মেলে না।
রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার পিরোজপুর এলাকার বাসিন্দা আঙ্গুরা বেগম তিন বছর আগে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে ছেলেকে ব্যবসা করতে দেন। পরে আরও এক লাখ টাকা ঋণ নেন। ছেলের নেশাগ্রস্ততার কারণে ব্যবসা ভেঙে পড়লে বর্তমানে তাঁর মোট ঋণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার টাকা। চারটি প্রতিষ্ঠানে দেনা, সাপ্তাহিক কিস্তি প্রায় ৫,৫০০ টাকা। গরুর দুধ ও ফসল বিক্রি করে কোনোভাবে কিস্তি পরিশোধের চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন, ‘একটা ঋণ শোধ করতে আরেকটা নিতে হয়। এই হিসাবের কোনো শেষ নেই।’
চারঘাট, বাঘা, পুঠিয়া ও দুর্গাপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ পরিবার একাধিক এনজিও ঋণে জর্জরিত। অনেকে গহনা বিক্রি বা জমি বন্ধক রেখেও কিস্তি সামলাতে পারছেন না। দিন শেষে আবার খাতার সামনে বসেন। হিসাব মেলানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু কিস্তির টাকা জোগাড় হয় না। তবুও ভাবেন, নতুন ঋণই হয়তো একমাত্র ভরসা। অথচ সেই পথই তাঁকে আরও গভীর সংকটে ঠেলে দিচ্ছে। পুঠিয়ার জামিরা গ্রামের মমেনা বেগম বলেন, ‘শুরুতে সহজ মনে হয়। পরে বুঝি, এটা থেকে বের হওয়া কঠিন। গ্রামে এমন পরিবার কমই আছে; যারা ঋণের বাইরে।’
ঋণের চাপ সামাজিক বিপর্যয়ে রূপ নিচ্ছে। চারঘাটের বনকিশোর এলাকার মিঠুন দাসের মোট ঋণ প্রায় ৫ লাখ টাকা। পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে সামাজিক মাধ্যমে লাইভে এসে ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন। একইভাবে পঁওরা এলাকার মাছচাষি আব্দুল কুদ্দুস একাধিক ঋণের চাপে আত্মহত্যা করেন।
ঋণ শোধে ব্যর্থ হয়ে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাও বাড়ছে। মুংলি গ্রামের সেলিম হোসেন প্রায় এক বছর আগে পরিবারসহ এলাকা ছেড়েছেন। তাঁর ছেলে এসএসসি পরীক্ষা দিতে পারেনি। মীরগঞ্জের শরীফ উদ্দিনও ৭ মাস ধরে এলাকা ছাড়া। এ সময়ে তাঁর সন্তান জন্মালেও তিনি বাড়ি ফিরতে পারেননি।
এ অঞ্চলে নারীদের নামে ঋণ নেওয়া হলেও তা ব্যবহার করেন পুরুষ সদস্যরা। এতে ঋণের দায় গিয়ে পড়ে নারীর ওপর। মিঠুন দাসের মৃত্যুর পর তাঁর মা শ্রীমতি রানী বলেন, ‘ছেলে মারা গেলেও এনজিও কিস্তি চাইছে। শোধ করার টাকা নেই। তাই আমিও বাড়ি ছাড়া।’ দুর্গাপুরের আফরোজা খাতুন জানান, আস্থার কারণে নারীদের ঋণ দিয়ে থাকে এনজিওগুলো। এ সুযোগ নেয় বাড়ির পুরুষরা। তাদের কথামতো ঋণ নিতে অস্বীকৃতি জানালে অনেক নারী পারিবারিক সহিংসতার শিকার হচ্ছেন।
চারঘাটে মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির নিবন্ধিত এনজিও রয়েছে ২৩টি। সমবায় অধিদপ্তরের ৩১টি এবং সমাজসেবার ১২টি সমিতিও ঋণ কার্যক্রম চালাচ্ছে। তবে নামে-বেনামে আরও বহু সংস্থা সক্রিয়।
বেসরকারি সংস্থা রুরাল আন্ডার প্রিভিলেইজড অ্যান্ড ল্যান্ডলেস ফারমার্স অর্গানাইজেশন (রুলফাও)-এর পরিচালক আফজাল হোসেন বলেন, ‘যাচাই ছাড়া ঋণ দেওয়ায় একজন ব্যক্তি একাধিক প্রতিষ্ঠানে ঋণ নিয়ে সংকটে পড়ছেন।’
টার্গেট পূরণের বিষয়ে ইএসডিও চারঘাট শাখার ব্যবস্থাপক শাহ আলম বলেন, ‘ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো (সিআইবি) জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে কাজ করছেন। সিআইবির কাজ শেষ হলে একজন গ্রাহকের পরিচয়পত্র দিয়ে যাচাই করা যাবে তাঁর আর কোনো সংস্থায় বা ব্যাংকে ঋণ আছে কিনা। তবে অনেক এনজিওর কর্মীরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা না করেই ঋণদান করেন বলেও মত দেন তিনি।’
ইএসডিও চারঘাট শাখার ব্যবস্থাপক শাহ আলম জানান, ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো (সিআইবি) জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে কাজ করছে। তাদের কার্যক্রম পুরোপুরি চালু হলে যাচাই সহজ হবে।
সুজন চারঘাটের সভাপতি মো. কামরুজ্জামান বলেন, ‘মানুষ আত্মহত্যা করছে, পরিবার পালিয়ে যাচ্ছে–এখনই ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।’ চারঘাট ইউএনও জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, ‘ঋণ কার্যক্রমে নজরদারি ও সচেতনতা বাড়ানো হচ্ছে।’
- বিষয় :
- আত্মহত্যা
