ডিএনএ পরীক্ষায় প্রমাণিত স্বীকৃতি দিতে নারাজ বাবা
শিশু হালিমা মুর্শেদাকে কোলে নিয়ে নবীগঞ্জের ভুক্তভোগী মা স্বপ্না বেগম সমকাল
নবীগঞ্জ (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৩ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:০৭ | আপডেট: ২৩ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:১৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
তিন বছরের শিশু হালিমা মুর্শেদার পিতৃপরিচয় পেতে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন স্বপ্না নামের এক তরুণী মা। জানা গেছে, সন্তান ও নিজের অধিকার নিশ্চিতে মামলা করে বিপাকে পড়েছেন স্বপ্না ও তাঁর পরিবার। অপরাধী না হয়েও পালিয়ে বেড়াচ্ছেন এলাকা ছেড়ে। অন্যদিকে তাদের অধিকার বঞ্চিত করেও বহাল তবিয়তে আছেন মামলার বিবাদী, স্বপ্নার স্বামী হিসেবে পরিচয় নিশ্চিত হওয়া এক প্রভাবশালী ব্যক্তি। এমন ঘটনা ঘিরে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার কামারগাঁও গ্রামে। বিষয়টি নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনার শাখা মেলছে সামাজিক মাধ্যমে।
জানা যায়, কামারগাঁওয়ের প্রভাবশালী মাতবর মুর্শেদ চৌধুরীর বাড়িতে গৃহপরিচারিকার কাজ করতেন তরুণী স্বপ্না। বিভিন্ন সময় তাঁকে নানা প্রলোভন দেখিয়ে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন গৃহকর্তা মুর্শেদ। একপর্যায়ে বিয়ের প্রলোভনে তাঁকে ধর্ষণ করা হয়। পরবর্তী সময়ে তাঁর ঘরে জন্ম নেয় এক কন্যা শিশু। বর্তমানে শিশুটির বয়স তিন বছর। তার নাম হালিমা মুর্শেদ।
এ নিয়ে এলাকায় কয়েক দফা সালিশ সভা হলেও প্রভাবশালী মুর্শেদ চৌধুরী সে রায় অমান্য করেন। তিনি স্বপ্নাকে হুমকি দিয়ে এলাকা ছাড়া করেন।সমাজের চোখে পিতৃহীন সন্তানের লজ্জা ঢাকতে এবং মা-মেয়ের অধিকার পেতে সন্তানের পিতৃপরিচয়ের জন্য আদালতের দ্বারস্থ হন স্বপ্না। ২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর এ ঘটনায় হবিগঞ্জের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে অভিযুক্ত মুর্শেদ আহমদ চৌধুরীকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন স্বপ্না বেগম। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে এর তদন্ত ভার পিবিআইকে অর্পণ করেন।
হবিগঞ্জ পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তাদের তদন্তে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়। একই সঙ্গে আদালতের নির্দেশে সম্পন্ন করা ডিএনএ পরীক্ষায় শিশু হালিমার জৈবিক পিতা হিসেবে অভিযুক্ত মুর্শেদ আহমদ চৌধুরীর পরিচয় নিশ্চিত হয়।
স্বপ্নার অভিযোগ, আদালতে বিষয়টি প্রমাণ হওয়ার পরেও তা মেনে না নিয়ে উল্টো তাঁকে অভিযোগ প্রত্যাহারের জন্য হুমকি দিচ্ছেন গৃহকর্তা।
আদালতে জমা দেওয়া পিবিআইয়ের তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, নবীগঞ্জ উপজেলার দীঘলবাক ইউনিয়নের কামারগাঁও গ্রামের আর্শ্বদ চৌধুরীর ছেলে মুর্শেদ চৌধুরী মুর্শিদ তাঁর গৃহপরিচারিকা করগাঁও ইউনিয়নের কামালপুর গ্রামের সামছু মিয়ার মেয়ে স্বপ্না বেগমকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন সময় ধর্ষণ করেন। ভুক্তভোগীর অসহায়ত্ব ও মানসিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে এই ঘটনা ঘটে।
এতে আরও বলা হয়, ২০২২ সালের অক্টোবর থেকে অভিযুক্তের বাড়িতে কাজ করার সময় থেকেই ভুক্তভোগী স্বপ্নার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন মুর্শেদ চৌধুরী; যা একাধিকবার শারীরিক নির্যাতনে রূপ নেয়। এক সময় ওই তরুণী অন্তঃসত্ত্বা হলে এলাকায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয় এবং স্থানীয়দের সালিশ সভায় জিজ্ঞাসাবাদে তিনি অভিযুক্তের নাম প্রকাশ করেন।
২০২৩ সালের ১৬ নভেম্বর নবীগঞ্জের দীঘলবাক ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে স্বপ্না একটি কন্যা সন্তানের জন্ম দেন। সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যকেন্দ্রের রেজিস্ট্রারে প্রথমে শিশুটির বাবার নাম হিসেবে অভিযুক্তের নাম লিপিবদ্ধ হলেও পরে তা কেটে দেওয়া হয় বলে তদন্তে জানা গেছে।
মামলা তদন্তকালে পিবিআই কর্মকর্তারা বিভিন্ন সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ করেন এবং একাধিকবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পান। এরপর অধিকতর নিশ্চিতের জন্য আদালতে ডিএনএ পরীক্ষার অনুমতি চাইলে আদালতের অনুমতিক্রমে সেই পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়। পরীক্ষার ফলাফলে নিশ্চিতভাবে উল্লেখ করা হয় যে, হালিমা বেগম মুর্শেদা নামের ওই কন্যা সন্তানের জৈবিক পিতা অভিযুক্ত মুর্শেদ আহমদ চৌধুরী মুর্শিদ (৫৫)।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ভুক্তভোগী স্বপ্না আগে বিবাহিত ছিলেন এবং বর্তমানে অসহায় অবস্থায় জীবনযাপন করছেন। অভিযুক্ত ব্যক্তি শুরু থেকেই ধর্ষণের অভিযোগ ও সন্তানের পিতৃত্ব অস্বীকার করে আসছিলেন।
চলতি এপ্রিল মাসে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সুজন চন্দ্র পাল স্বাক্ষরিত এ প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা হয়। এর পর থেকেই অভিযুক্তের ছেলে নবীগঞ্জ উপজেলা স্কুলের শিক্ষক জামিল আহমেদ চৌধুরী খোকন স্বপ্নাকে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য নানাভাবে হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করছেন। এমনটাই জানিয়েছেন স্বপ্না।
এ বিষয়ে মুর্শেদ আহমদ চৌধুরীর সঙ্গে কথা বলতে তাঁর মোবাইল ফোন নাম্বারে কল করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। তাঁর ছেলে জামিল আহমেদ চৌধুরী খোকনের সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বলতে চাইলে তিনি বিষয়টি অস্বীকার করে এড়িয়ে যান। খোকনের দাবি, তাঁর বাবাকে ফাঁসানো হয়েছে।
এ বিষয়ে ভুক্তভোগী স্বপ্না বেগম বলেন, মুর্শেদ চৌধুরী বিয়ে করবেন বলে প্রায় দুই বছর তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক রাখেন। পরে তাঁকে বার বার বিয়ের জন্য বললেও রাজি হননি। এখন তিন বছরের সন্তান নিয়ে মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াচ্ছেন তিনি। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সুজন চন্দ্র পাল বলেন, এক বছর মামলাটি তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন আদালতে।
- বিষয় :
- হবিগঞ্জ
- ডিএনএ টেস্ট
- বিয়ের প্রতিশ্রুতি
