ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

৩২ বছর ধরে আলো ছড়ানো বিদ্যালয়টি সরকারি হয়নি

৩২ বছর ধরে আলো ছড়ানো বিদ্যালয়টি সরকারি হয়নি
×

রূপগঞ্জের ভায়েলা-মিয়াবাড়ি বিদ্যালয়ের জীর্ণ ভবনের বারান্দায় বসে আছেন কয়েকজন অভিভাবক। গতকাল তোলা সমকাল

 রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি 

প্রকাশ: ২৪ এপ্রিল ২০২৬ | ০৯:৫০

| প্রিন্ট সংস্করণ

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার ভুলতা ইউনিয়নের ভায়েলা-মিয়াবাড়ি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ৩২ বছর ধরে এলাকার দরিদ্র পরিবারের শিশুদের শিক্ষার একমাত্র আশ্রয়স্থল। জরাজীর্ণ টিনের ঘর, নেই বিদ্যুৎ, তীব্র গরমেও নেই ফ্যান, নেই মানসম্মত অবকাঠামো, তবু থেমে নেই পাঠদান। মানবিক দায়বদ্ধতায় বিনা বেতনে চারজন শিক্ষক চালিয়ে যাচ্ছেন শিক্ষা কার্যক্রম। প্রায় তিন যুগেও বিদ্যালয়টির প্রতি নজর পড়েনি প্রশাসনের। হয়নি সরকারীকরণ।

ভুলতা ইউনিয়নে প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে দুটি– একটি ভুলতায়, অন্যটি মাসুমাবাদে। দুটির মধ্যে দূরত্ব ১১ কিলোমিটার। এ দুটির মধ্যে পড়েছে ভায়েলা-মিয়াবাড়ি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। সবচেয়ে কাছের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টিও পাঁচ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বে অবস্থিত। এলাকার সচ্ছল পরিবারগুলো সন্তানদের দূরের কিন্ডারগার্টেনে ভর্তি করে। বিপাকে পড়ে দরিদ্র পরিবারগুলো।
সরেজমিন দেখা গেছে, ভাঙাচোরা টিনের চালা, ফাঁকা জানালা, মাটির মেঝে আর অপ্রতুল বেঞ্চ– এই অবস্থায় প্রতিদিন পাঠ নেয় চার শতাধিক শিক্ষার্থী। প্রচণ্ড গরমে ঘেমেনেয়ে একাকার শিশুদের অনেকেই ক্লাস চলাকালীন অসুস্থ হয়ে পড়ে। বৃষ্টির দিনে টিনের ছিদ্র দিয়ে পানি পড়ে ভিজে যায় বই-খাতা। নেই কোনো টয়লেট সুবিধা। নেই সীমানা প্রাচীর। পাশেই গভীর পুকুর, ফলে সারাক্ষণ দুর্ঘটনার আশঙ্কা।
শিক্ষকরা জানান, এ বছর পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ছে ৩৫ জন শিক্ষার্থী। প্রতিবছরই প্রায় শতভাগ শিক্ষার্থী প্রাথমিকের গণ্ডি পেরোয়।

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল মালেক বলেন, আমাদের এলাকায় গরিব মানুষের সংখ্যা বেশি। দূরের সরকারি স্কুলে পাঠানোর সামর্থ্য নেই। এই স্কুলটাই আমাদের ভরসা। কিন্তু এমন অবস্থায় আর কতদিন চলবে? আরেক বাসিন্দা রহিমা খাতুন বলেন, শিশুরা রোদে-গরমে কষ্ট করে পড়ে। সরকার যদি একটু দৃষ্টি দিত, তাহলে তাদের ভবিষ্যৎ আলোকিত হতো।
জানা গেছে, ১৯৯২ সালে প্রয়াত শিক্ষক সুফিয়া বেগম ও তাঁর স্বামী আইয়ুব আলী ভূঁইয়া এলাকার দরিদ্র শিশুদের শিক্ষার কথা ভেবে ৩৩ শতাংশ জমিতে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন। তাদের সন্তানরা এখনও সেই আদর্শ ধরে রেখেছেন। জমিদাতার মেয়ে শামীমা সুলতানা বলেন, আমার মা-বাবা গরিব মানুষের সন্তানদের জন্য এই জমি দিয়েছেন। স্কুলটি সরকারীকরণে জমি নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। আমরা চাই দ্রুত সরকারীকরণ হোক। ছেলে শফিকুল ইসলাম জুয়েল বলেন, সব ধরনের শর্ত পূরণ করার পরও কেন এত বছরেও স্কুলটি সরকারীকরণ হয়নি, সেটাই বড় প্রশ্ন।
বিদ্যালয়টি বর্তমানে প্রধান শিক্ষক আবু সুফিয়ানসহ শাহিনুর বেগম, রুবিয়া আক্তার ও সোনিয়া আক্তার এই চারজন শিক্ষক দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। তারা বছরের পর বছর বিনা বেতনে পাঠদান করে যাচ্ছেন। আবু সুফিয়ান বলেন, আমরা এই স্কুলের শিক্ষার্থী ছিলাম। এলাকার শিশুদের জন্য মায়া থেকেই বিনা বেতনে পড়াচ্ছি। সরকারিভাবে সহায়তা পেলে শিক্ষার মান আরও উন্নত করা সম্ভব।
শিক্ষকদের অভিযোগ, বিদ্যালয়ে প্রায়ই মাদকসেবীদের আনাগোনা ঘটে। প্রতিবাদ করলে হুমকির মুখে পড়তে হয়। বিদ্যালয়ের মালপত্র চুরির ঘটনাও ঘটেছে একাধিকবার। এতে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থী সুমাইয়া আক্তার বলে, বৃষ্টি এলে ক্লাস করা যায় না, পানি পড়ে সব ভিজে যায়। গরমে খুব কষ্ট হয়। আরেক শিক্ষার্থী রাকিব হোসেন বলে, স্কুলে ফ্যান নেই, টয়লেট নেই। গরমে অনেক সময় অসুস্থ হয়ে পড়ি।

ভুলতা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আরিফুল হক ভূঁইয়া বলেন, বিদ্যালয়টি অত্যন্ত অবহেলিত। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে কিছু সহায়তা দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সরকারীকরণ ছাড়া স্থায়ী উন্নয়ন সম্ভব নয়।
রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, বিদ্যালয়টি সরকারীকরণের জন্য প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো বিবেচনায় রয়েছে। বরাদ্দ পেলে দ্রুত উন্নয়ন করা হবে এবং স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
নিরাপত্তাহীনতার কথা জেনে সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মেহেদী ইসলাম বলেন, বিদ্যালয় এলাকায় মাদকসেবীদের আনাগোনা বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) আসনের এমপি মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু বলেন, বিদ্যালয়টি দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত। দ্রুত সরকারীকরণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

আরও পড়ুন

×