ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

বিদ্যানন্দে নেই মাধ্যমিক বিদ্যালয় শিক্ষাবঞ্চিত শত শত শিশু

বিদ্যানন্দে নেই মাধ্যমিক বিদ্যালয় শিক্ষাবঞ্চিত শত শত শিশু
×

 রাজারহাট (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২৪ এপ্রিল ২০২৬ | ০৯:৫৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

শিক্ষা একটি জাতির ভিত্তি। শিক্ষা ছাড়া উন্নয়ন অসম্পূর্ণ। অথচ স্বাধীনতার ৫৪ বছর পার হলেও কুড়িগ্রামের রাজারহাটে তিস্তা নদীবিধৌত চর বিদ্যানন্দ আজও মাধ্যমিক শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। নদীঘেরা এই জনপদে প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও মাধ্যমিক স্তরে কোনো বিদ্যালয় বা মাদ্রাসা নেই। ফলে শত শত শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন পঞ্চম শ্রেণিতেই থেমে যাচ্ছে। দুর্গম যাতায়াত, দারিদ্র্য ও অবহেলার কারণে চর বিদ্যানন্দের শিশুরা ধীরে ধীরে শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ছে। 

উপজেলার বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে তিস্তা নদী দ্বারা বিধৌত চর বিদ্যানন্দ মৌজা এবং তৈয়বখাঁ মৌজার আংশিক এলাকা। অনেকের কাছে এলাকাটি ‘আনন্দ বাজার’ নামেও পরিচিত। কথিত আছে, বহু বছর আগে বিদ্যান নামে এক জমিদার এবং তাঁর একমাত্র পুত্র নন্দের যৌথ নামানুসারেই গ্রামের নাম রাখা হয় বিদ্যানন্দ।
চর বিদ্যানন্দ ও চর তৈয়বখাঁ– এ দুই গ্রামে প্রায় আট হাজার মানুষের বসবাস। এর মধ্যে বিভিন্ন স্তরের প্রায় দেড় হাজার শিক্ষার্থী রয়েছে। এখানে বর্তমানে তিনটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এগুলো হলো– পশ্চিম চর বিদ্যানন্দ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বিদ্যানন্দ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও চর তৈয়বখাঁ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, মাধ্যমিক পর্যায়ে একটি বিদ্যালয় বা মাদ্রাসাও নেই।

পথে পথে ঝুঁকি
এদিকে বিদ্যালয় না থাকায় মাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনা করতে হলে শিক্ষার্থীদের কয়েক কিলোমিটার হেঁটে তিস্তা নদী পার হয়ে ডাংরারহাট উচ্চ বিদ্যালয় অথবা ডাংরারহাট আলিম মাদ্রাসায় যেতে হয়। এই দীর্ঘ ও ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রার কারণে অনেক শিক্ষার্থী পঞ্চম শ্রেণির পর আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে না। ফলে দুই গ্রামের শিশুরা শিক্ষাক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ছে। শিক্ষার অভাবে এরা নানা রোগব্যাধি ও পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। অশিক্ষা ও কুসংস্কার ধীরে ধীরে গ্রামটিকে গ্রাস করছে। শিক্ষা না থাকায় সচেতনতার অভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
কিছু সচ্ছল পরিবার তাদের সন্তানদের রংপুরের কাউনিয়া বা পীরগাছা উপজেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি করিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে সড়কপথে পাঁচ থেকে সাত কিলোমিটার যেতে হয়। এতে একজন শিক্ষার্থীর যাতায়াতে মাসে গড়ে এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকা খরচ হয়, যা দরিদ্র পরিবারের পক্ষে বহন করা কঠিন। এই পথও নিরাপদ নয়। দুই থেকে তিন কিলোমিটার কাঁচা রাস্তায় রয়েছে দুটি ক্যানেল ও একাধিক বড় গর্ত। ছোট যানবাহন চলাচল করে ঝুঁকি নিয়ে। বর্ষায় এ চলাচলও ব্যাপক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে।  

বাড়ছে ঝরে পড়ার সংখ্যা ও বাল্যবিয়ে
দুর্গম ও দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার পাশাপাশি চরাঞ্চলের শিশুদের লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে আরও একটি বড় বাধা হলো দারিদ্র্য। চর তৈয়বখাঁ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রিয়াজুল ইসলাম বলেন, এই এলাকায় প্রাথমিক স্তরে মেয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। কিন্তু মাধ্যমিক বিদ্যালয় না থাকায় গত চার-পাঁচ বছরে তাদের বেশির ভাগ পঞ্চম শ্রেণির পর আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেনি। অনেকেরই বিয়ে হয়ে গেছে। একই কথা বলেন, বিদ্যানন্দ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক অনন্ত কুমার এবং চর বিদ্যানন্দ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দুদু মিয়া। 

চর বিদ্যানন্দ গ্রামের অভিভাবক আব্দুল করিম বলেন, ‘এখানে তিনটি প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও মাধ্যমিক বিদ্যালয় না থাকায় বেশির ভাগ শিক্ষার্থী পঞ্চম শ্রেণির পর আর পড়াশোনা করতে পারে না।’ ২০২৪ সালে পঞ্চম শ্রেণি পাস করা শিক্ষার্থী রাকিবুল ইসলামের বাবা আলীফ নুর বলেন, ‘হামরা গরিব মানুষ। রিকশা-অটো ভাড়া দিয়া ছেলেকে পড়ানোর সামর্থ্য নাই।’ একই ধরনের বক্তব্য দেন ২০২৩ সালে পঞ্চম শ্রেণি পাস করা শিক্ষার্থী ফাতেমা বেগমের বাবা ফয়জার হোসেনসহ আরও অনেকে।
চর বিদ্যানন্দের বাসিন্দা ও সরকারি চাকরিজীবী মাসুদ রানা বলেন, চর বিদ্যানন্দের শিক্ষাবঞ্চিত শিশুদের ভবিষ্যৎ রক্ষায় প্রয়োজন দ্রুত একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় বা মাদ্রাসা স্থাপন, নদী পারাপারের নিরাপদ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য উপবৃত্তি ও সহায়তা এবং মেয়েশিশুদের বাল্যবিয়ে রোধে বিশেষ নজরদারি। 

যা বলছেন জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ
চর বিদ্যানন্দ মৌজার ইউপি সদস্য হোসেন আলী বলেন, ‘চর বিদ্যানন্দের শিশুদের স্বপ্ন দেখার অধিকার আছে। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় আজ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। আগেও আমরা একাধিকবার সাবেক সংসদ সদস্যদের কাছে দাবি জানিয়েছি, কিন্তু কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।’
ইউএনও আল ইমরান বলেন, চর বিদ্যানন্দে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি দিয়েছি।

আরও পড়ুন

×