ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

এক সপ্তাহে উধাও এনজিও কৌশলে বারবার প্রতারণা

এক সপ্তাহে উধাও এনজিও কৌশলে বারবার প্রতারণা
×

সনি আজাদ, চারঘাট (রাজশাহী)

প্রকাশ: ২৫ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:৩৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

‘মাত্র ১০ শতাংশ জমা দিলেই ঋণ’– এই একটি বাক্যই যেন হয়ে উঠেছে রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার শত শত মানুষের সর্বনাশের ফাঁদ। সহজ শর্তে এক থেকে পাঁচ লাখ টাকা ঋণের প্রলোভন দেখিয়ে একের পর এক ভুয়া এনজিও গড়ে উঠছে। আবার গ্রাহকের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহ করে অল্প সময়েই গা-ঢাকা দিচ্ছে। প্রশাসনের নজরদারি না থাকা আর সাধারণ মানুষের অসচেতনতার সুযোগে সংঘবদ্ধ চক্র বছরের পর বছর ধরে একই কৌশলে প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছে।

চারঘাটে এক মাসের ব্যবধানে ‘পল্লী নারী জাগরণ সংস্থা’ ও ‘পুষ্টিবিদ ফাউন্ডেশন’ নামে দুটি কথিত এনজিও শত শত মানুষের কাছ থেকে বিপুল টাকা নিয়ে উধাও হয়ে গেছে। দুটির অফিসই ছিল উপজেলার পল্লী বিদ্যুৎ মোড়ে। সহকারী পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের মাত্র ১০০ মিটারের মধ্যে। 

সর্বশেষ ঘটনাটি ঘটেছে ‘পুষ্টিবিদ ফাউন্ডেশন’ নামে একটি কথিত এনজিওকে ঘিরে। কৃষি প্রকল্প ও মাতৃত্বকালীন সেবার নামে সদস্য সংগ্রহ করে এনজিওটি। শর্ত ছিল, ঋণ পেতে হলে আগে নির্ধারিত টাকার ১০ শতাংশ জমা দিতে হবে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কয়েকশ মানুষ এই প্রলোভনে পড়ে লাখ লাখ টাকা জমা দেন। কিন্তু ঋণ প্রদানের দিন অফিস বন্ধ করে উধাও হয়ে যায় প্রতিষ্ঠানটি।

পুরোনো কৌশল, নতুন নাম
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এ ধরনের প্রতারণা নতুন নয়। মাস ছয়েক আগে চারঘাটের মুক্তারপুর এলাকায় ‘রাজশাহী মহিলা হস্তশিল্প সমিতি’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান প্রশিক্ষণ ও সহজ ঋণের প্রলোভন দেখিয়ে প্রায় দেড় হাজার নারীর কাছ থেকে অর্ধকোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। তাদের কৌশলও ছিল একই; লিফলেট বিতরণ, মাইকিং এবং ‘সহজ শর্তে ঋণ’-এর প্রতিশ্রুতি।
রাজশাহী মহিলা হস্তশিল্প সমিতির সদস্যপদ নেওয়া ভুক্তভোগী রুবিনা খাতুন বলেন, এনজিওর লোকদের প্ররোচনায় পড়ে তিনি ১৭৫ সদস্যের পাঁচটি দল তৈরি করেন। সবাই প্রশিক্ষণ পেতে ৫-১০ হাজার টাকা দেয়। এভাবে চারঘাট-বাঘার প্রায় দেড় হাজার মানুষ প্রশিক্ষণের জন্য টাকা জমা দেয়। তারা প্রায় অর্ধকোটি টাকা নিয়ে পালিয়ে গেছে। কিন্তু আমরা যারা দলনেতা হয়েছিলাম, তারা এখন বেকায়দায় পড়েছি। 

এক সপ্তাহে উধাও ‘পুষ্টিবিদ ফাউন্ডেশন’ 
‘পুষ্টিবিদ ফাউন্ডেশন’-এর কর্মকর্তা পরিচয়ে কিছু লোক কৃষি প্রকল্প ও মাতৃত্বকালীন সেবার কথা বলে সম্প্রতি এলাকায় ও বাজারে মাইকিং করে। পল্লী বিদ্যুৎ মোড়ে সহকারী পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের পশ্চিম পাশে মোহাম্মদ সনেটের বাসার নিচতলায় অফিস নিয়ে সাইনবোর্ড টাঙানো হয়।
বুধবার ও বৃহস্পতিবার সেই অফিসে গিয়ে দেখা যায়, বড় করে পুষ্টিবিদ ফাউন্ডেশনের সাইনবোর্ড লাগানো, তবে অফিসে তালা। অনেক ভুক্তভোগীকে সেখানে হা-হুতাশ করতে দেখা যায়। কেউ জমানো টাকা, কেউ ধারদেনা করে আবার কেউ গরু-ছাগল বিক্রি করে ঋণ পেতে সমিতিতে জামানতের টাকা জমা দিয়েছিলেন। 
সরদহ ইউনিয়নের ঝিকরা গ্রামের চা দোকানি হাসিবুর রহমান বলেন, পুষ্টিবিদ ফাউন্ডেশন বাজারে মাইকিং করে সকল ক্ষুদ্র দোকানিকে নিয়ে বসেছিল। সেখানে তাদের বলা হয়, ১০-২০ শতাংশ টাকা জমা দিলে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ পাওয়া যাবে। ঋণ চলাকালীন মেয়েদের মাতৃত্বকালীন ভাতা ও কৃষিকাজে জড়িতদের কৃষক ভাতা দেওয়া হবে। আমরা বাজারের ২৩ জন দোকানি ঋণ পেতে ১০-৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত জমা দিয়েছি।

চাইপাড়া এলাকার পারভিন সুলতানা বলেন, গ্রামে এসে তারা আমাদের নিয়ে বসে। দুই বছর মেয়াদি ঋণ আর বাচ্চাদের পুষ্টির জন্য ভাতা দেওয়ার কথা বলে। আমরা বিশ্বাস করে টাকা দিয়েছি। চার শতাধিক মানুষ টাকা দিয়েছে বলে শুনেছি।
পুষ্টিবিদ ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপক পরিচয় দেওয়া ডালিম মাহমুদের যোগাযোগের নম্বরে ফোন করলে ‘ভুল নম্বর’ বলে পরিচয় দিয়ে কল কেটে দেওয়া হয়।

একই নাটক বারবার
এক মাস আগেই একই এলাকায় ‘পল্লী নারী জাগরণ সংস্থা’ প্রায় একই কৌশলে প্রতারণা চালায়। এনজিও উদ্বোধনের নামে পাঁচ শতাধিক মানুষের জন্য খাবারের আয়োজনের ঘোষণা দেওয়া হয়। এতে প্রতিষ্ঠানটির প্রতি মানুষের আস্থা আরও বাড়ে। অনেকে বেশি পরিমাণে জামানত জমা দেন। কিন্তু নির্ধারিত দিনে গিয়ে দেখা যায় অফিস খালি।
গৌড়শহরপুর গ্রামের রেজিয়া সুলতানা বলেন, তিন লাখ টাকা ঋণের জন্য সিজারিয়ান অপারেশনের জন্য জমানো ৩০ হাজার টাকা দিয়েছিলাম। এনজিও এবং ঋণ কার্যক্রমের উদ্বোধন একই দিনে হওয়ার কথা ছিল। দাওয়াতের অতিথি ও আমরা ঋণ নিতে গিয়ে দেখি তারা পালিয়েছে। পাঁচ শতাধিক মানুষ জামানত দিয়েছিল। থানায় অভিযোগ দিয়েছিলাম কিন্তু সুরাহা হয়নি।

কেন থামছে না এই প্রতারণা
স্থানীয়দের মতে, কয়েকটি কারণে এই প্রতারণা বারবার সফল হচ্ছে। সহজ শর্তে ঋণের আকর্ষণ, একসঙ্গে অনেক মানুষের যুক্ত হওয়ায় ভরসা তৈরি, বড়সড় প্রচারণা, মানুষের আস্থা অর্জনের প্রয়াস ও প্রশাসনিক নজরদারির অভাব। 

সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের চারঘাট উপজেলার সভাপতি মো. কামরুজ্জামান বলেন, এসব ভুয়া এনজিও উপজেলা সদরে এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বাসা ভাড়া নেয়। এতে সাধারণ মানুষ সহজেই তাদের বিশ্বাস করে। এ জন্য বাসা ভাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রে মালিকদের আরও যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন। 
চারঘাট মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল মালেক বলেন, আগের এনজিওগুলোর প্রতারণা সম্পর্কে তাদের জানা নেই। তবে পুষ্টিবিদ ফাউন্ডেশনের নামে যেটা ঘটেছে, সেটা তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 
ভারপ্রাপ্ত ইউএনও মো. রাহাতুল করিম মিজান বলেন, প্রতারণা রোধে ইতোমধ্যে চারঘাটে যেসব এনজিও কার্যক্রম পরিচালনা করে তাদের একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। ভুয়া এনজিও প্রমাণিত হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আরও পড়ুন

×