ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

জব্বারের বলীখেলা

আসর মাতিয়ে ফের সেরা বাঘা শরীফ

আসর মাতিয়ে ফের সেরা বাঘা শরীফ
×

বাঘা শরীফ। ছবি: সংগৃহীত

আহমেদ কুতুব, চট্টগ্রাম

প্রকাশ: ২৫ এপ্রিল ২০২৬ | ২৩:৩৬

‘১৪ বছর ধরে বলীখেলা খেলছি। এর জন্য নিজেকে ফিট রাখি প্রতিদিন। রোজ দুটি ডিম ও হাফ কেজি গরুর দুধ খাই। সকালে ঘুম থেকে উঠেই আগের রাতে ভিজিয়ে রাখা ছোলা খাই। এর পর দুই ঘণ্টা ব্যায়াম করি। নিয়মিত গরুর মাংসও খাই। নিজিকে ঝালিয়ে নিতে মাঝেমধ্যে অংশ নিই গ্রামের বলীখেলায়। তবে আমার মূল টার্গেট থাকে চট্টগ্রামের লালদীঘি মাঠের এই জব্বারের বলীখেলা।’

কথাগুলো বলছিলেন জব্বারের বলীখেলার ১১৭তম আসরের চ্যাম্পিয়ন কুমিল্লার বাঘা শরীফ। আজ শনিবার টানা তৃতীয়বারের মতো ফাইনালে জয়ী হয়ে তিনি হ্যাটট্রিক চ্যাম্পিয়ন হওয়ার রেকর্ড গড়লেন। এবারের আসরে ১০৮ জন বলীখেলায় অংশ নিয়েছিলেন।

জব্বারের বলীখেলায় নিয়মিত অংশ নিচ্ছেন কুমিল্লার হোমনা থানার মনিপুর গ্রামের বলী মো. শরীফ। সবার কাছে তিনি ‘বাঘা শরীফ’ নামে পরিচিত। এ বছরের ফাইনালে বাঘা শরীফ ২৪ মিনিট ২৬ সেকেন্ডের খেলায় রাশেদ বলীকে পরাজিত করে শিরোপা ছিনিয়ে নেন। এর আগের দুই আসরেও তিনি চ্যাম্পিয়ন হন।

বিকেলে হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে চট্টগ্রাম নগরীর লালদীঘি মাঠে দিনব্যাপী বলীখেলার তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। বিকেলে ফাইনাল খেলায় দুই বলীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চলে। শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে খেলেন দুই বলী বাঘা শরীফ ও রাশেদ বলী। শেষ হাসি হাসেন শরীফ।

চ্যাম্পিয়ন বাঘা শরীফ সমকালকে বলেন, ‘১৪ বছর ধরে বলীখেলা খেলছি। অনেকক্ষণ ধরে বলী খেলে প্রতিপক্ষকে দুর্বল করেই বিজয় চিনিয়ে নিই। এ কৌশলে টানা তিনবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছি। আমার পাশের গ্রাম ওমরাবাদের আরেক চ্যাম্পিয়ন শাহজালাল বলী ভাই আমার ওস্তাদ। কীভাবে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে হয়, তাঁর কাছ থেকে সে বিষয়ে টিপস পাই। তাঁর সঙ্গেই জব্বারের বলীখেলায় খেলতে এসেছিলাম। তাঁর কারণেই এখন আমি সারাদেশে বাঘা শরীফ নামে পরিচিত। আর কয়েক বছর খেলে তারপর অবসর নেব।’

বাঘা শরীফ পেশায় গরুর মাংস ব্যবসায়ী হলেও এখন তাঁর নেশা ও ভালোবাসা বলীখেলা। বলীখেলায় বীরত্বের কারণেই সারাদেশে তিনি ‘বাঘা শরীফ’ উপাধি পেয়েছেন। কুমিল্লার হোমনা থানার স্থানীয় মনিপুর বাজারে শরীফের গরুর মাংসের দোকান। তাঁর বাবা, চাচার সঙ্গে ওই দোকানে বসেন শরীফও। গত ১৪ বছরে শতাধিক বলীখেলায় বিজয়ী হয়েছেন তিনি। তবে জব্বারের বলীখেলায় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর দ্রুতই সারাদেশে খ্যাতি পেয়ে যান।

২০২৫ সালের ফাইনালে ১১ মিনিট খেলা হলেও এবার দ্বিগুণ– অর্থাৎ ২৫ মিনিট টান টান উত্তেজনাপূর্ণ জমজমাট খেলা চলেছে। প্রখর রোদের মধ্যে প্রথম রাউন্ডের বাছাইয়ে উত্তীর্ণ হন বাগেরহাটের মো. মামুন বলী, কুমিল্লার দিপু, নারায়ণগঞ্জের নুরুল ইসলাম ও সাভারের মো. মিঠু।

এর আগে প্রথম সেমিফাইনালে মুখোমুখি হন মিঠু ও রাশেদ বলী। খেলায় মিঠুকে হারিয়ে রাশেদ ফাইনালে ওঠেন। দ্বিতীয় সেমিফাইনালে মুখোমুখি হন বাঘা শরীফ ও শাহজালাল। সমঝোতার ভিত্তিতে বাঘা শরীফকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। চূড়ান্ত পর্বে ফাইনালে মুখোমুখি হন গতবারের দুই ফাইনালিস্ট বাঘা শরীফ ও রাশেদ। এ নিয়ে টানা তিন আসরে ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছেন তারা। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে জিতেছেন মিঠু। রাশেদ বলীও কুমিল্লা সদর উপজেলার জগন্নাথপুর ইউনিয়নের নসরাইল গ্রামের বাসিন্দা।

খেলার শুরুতে পঞ্চাশোর্ধ্ব চার বলীর দুটি খেলা অনুষ্ঠিত হয়। কয়েকজন তরুণ বলী খেলায় অংশ নেন। খেলা চলাকালে দর্শকরা হাততালি দিয়ে খেলোয়াড়দের উৎসাহ দিয়ে প্রাণবন্ত করে তোলেন আয়োজন। অন্যবারের মতো এবারের আসরেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ১০৮ জন বলীখেলায় অংশ নেন।

বলীখেলা আসরের উদ্বোধন করেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) কমিশনার হাসান মোহাম্মদ শওকত আলী। খেলা শেষে চ্যাম্পিয়ন ও রানারআপ বলীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন চট্টগ্রাম-৯ আসনের সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান। 

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে চট্টগ্রাম অঞ্চলের যুবকদের সংগঠিত ও শারীরিকভাবে প্রস্তুত করতে শহরের বদরপাতির ব্যবসায়ী আবদুল জব্বার সওদাগর ১৯০৯ সালে লালদীঘির ময়দানে এ খেলার আয়োজন করেন। পরে এ খেলা ‘জব্বারের বলীখেলা’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। বাংলা পঞ্জিকা অনুসারে ১২ বৈশাখ চট্টগ্রাম নগরীর ঐতিহাসিক লালদীঘি মাঠে এ খেলা হয়ে আসছে প্রতিবছর।

এই খেলাকে কেন্দ্র করে হওয়া মেলা রূপ নিয়েছে চট্টগ্রামবাসীর প্রাণের উৎসবে। লালদীঘি মাঠের আশপাশ ঘিরে প্রায় দুই-তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে আগের দিন ও পরদিন মিলিয়ে তিন দিন চলে এ লোকজ মেলা।

আরও পড়ুন

×