ঘেরে ঘেরে পানি সংকট, মরে যাচ্ছে চিংড়ি
পানি শুকিয়ে নেমেছে ঘেরের তলানিতে। শুক্রবার খুলনার ডুমুরিয়ার খোরেরাবাদ বিলে সমকাল
ডুমুরিয়া (খুলনা) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৮ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:০৬ | আপডেট: ২৮ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:৫৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
তিন বিঘা জমিতে চিংড়ি ঘের আছে আশিস কুমারের। গত বছর ৩০ হাজার গলদা চিংড়ির পোনা ছাড়েন। এসব মজুত ছিল ঘেরে। কিন্তু চলতি মৌসুমের অনাবৃষ্টি, ডিজেল-বিদ্যুৎ সংকটে পানি দিতে না পারায় তাঁর ঘেরের বিশাল এলাকা শুকিয়ে গেছে। এ কারণে প্রায় অর্ধেক মাছই মারা গেছে বলে জানান খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার এই মাছচাষি। সব মিলিয়ে তাঁর ক্ষতি হয়েছে দেড় লক্ষাধিক টাকার।
সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর তথ্যমতে, উপজেলায় প্রায় ৮৫ শতাংশ মানুষ চিংড়ি ও কার্প-জাতীয় মাছ চাষে যুক্ত। ১৪টি ইউনিয়নের ২২ হাজার ১৮৪ হেক্টর জমিতে মাছ চাষ হয়। এর মধ্যে বাগদা চিংড়ির ঘের আছে ছয় হাজার ৭৮১ হেক্টর জমিতে। গলদা চিংড়ির ঘেরের আয়তন ১১ হাজার ১৪৬ হেক্টর। আর চার হাজার ২৫৭ হেক্টর জমিতে চাষ হয় কার্প-জাতীয় মাছের। গত মৌসুমে ডুমুরিয়ার ১১ হাজার ১৪৬টি ঘেরে উৎপাদিত হয় সাত হাজার ৫৭৮ টন গলদা চিংড়ি। বিক্রি হয় ৬০৬ কোটি ২৪ লাখ টাকায়। ছয় হাজার ৭৮১টি ঘেরে বাগদা চিংড়ি উৎপাদিত হয়েছে দুই হাজার ৬১২ টন। বিক্রি হয়েছিল ২৩৫ কোটি আট লাখ টাকায়। এ ছাড়া হরিণা (ছোট চিংড়ি) ১৪ কোটি ৫০ লাখ, কার্প-জাতীয় মাছ ৪০৫ কোটি ৫০ লাখ ও অন্যান্য মাছ বিক্রি হয়েছে ৭৫ কোটি টাকায়।
চলতি বৈশাখের তীব্র তাপদাহে উপজেলার প্রায় পাঁচ হাজার ঘেরের গলদা ও কার্প-জাতীয় মাছ মারা গেছে বলে জানিয়েছেন চাষিরা। চলতি মৌসুমে একই জমিতে তারা মাছ চাষের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। কিন্তু পানি সংকটে বিপাকে পড়েছেন তারা। ডিজেল সংকটের কারণে সেচও দিতে পারছেন না। এতে করে এই মৌসুমে কয়েকশ কোটি টাকার ক্ষতি হবে।
উপজেলার শিবপুর গ্রামের আরজান আলী শেখের চার বিঘার ঘের। সেখানে এরই মধ্যে ১১ হাজার গলদা চিংড়ি মারা গেছে। এ কারণে তাঁর প্রায় আড়াই লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। ডুমুরিয়া সদর ইউনিয়নের কাঁটাখালী গ্রামের মো. মফিজুল ইসলাম মোল্লা, আব্দুল খালেক, মো. হাফিজ শেখ ও রবিউল সরদারের ঘেরের চিংড়িও তীব্র গরমে মারা গেছে। মাছ রক্ষায় ঘেরের পানির ওপর মাচা বানিয়েছেন। এতেও মাছ বাঁচানো যাচ্ছে না।
কুলবাড়িয়া গ্রামের প্রদীপ কুমার মণ্ডল ও বান্দা গ্রামের সজীব কুমার বিশ্বাস জানান, চাষিরা ভারতীয় ও দেশীয় হ্যাচারির ভাইরাসমুক্ত রেণুর প্রতি ঝুঁকেছেন। প্রতি হাজার রেণু কিনতে তাদের গুনতে হয় দুই হাজার ৮০০ থেকে তিন হাজার টাকা। দেশীয় চিংড়ির খাবার ভারতীয় চিংড়ির জন্য উপযুক্ত নয়। দুই জাতের চিংড়ির আলাদা খাবার লাগে। এবার খাবারের দাম খুবই চড়া। তার ওপর চলতি বৈশাখে বৃষ্টির দেখা মিলছে না। ফলে খালবিলও গেছে শুকিয়ে। ঘেরে চিংড়ির পোনা ছাড়া যাচ্ছে না। গত বছরের মজুত মাছও মারা যাচ্ছে। সবজিচাষিরাও একই দুর্ভোগে পড়েছেন। এসব চাষি এনজিও থেকে ঋণ বা চড়া সুদে টাকা নিয়ে আবাদ করেন। এবার ঋণ শোধ নিয়েই সবার দুশ্চিন্তা।
উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা সোয়েল মো. জিল্লুর রহমান রিগান বলেন, তাপদাহে ঘেরের মাছ মারা যাচ্ছে, এমন খবর চাষিরা জানাননি। তবে খোঁজখবর নেবেন। তিনি বলেন, মাছের ঘেরে অন্তত তিন ফুট পানি থাকতে হবে। না হলে পানি গরম হয়ে অক্সিজেন সংকট দেখা দেয়। এতে মাছ মারা যেতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
