ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

নারায়ণগঞ্জের কাজহরদী প্রাথমিক বিদ্যালয়

৩১৩ জন শিক্ষার্থীর জন্য তিনজন শিক্ষক

৩১৩ জন শিক্ষার্থীর জন্য তিনজন শিক্ষক
×

 শরীফ উদ্দিন সবুজ, নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:৪৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

স্কুলের শিক্ষার্থী ৩১৩ জন। শিক্ষকের পদ সাতটি, কিন্তু আছেন মাত্র চারজন। একজন আবার মাতৃত্বকালীন ছুটিতে। ফলে ক্লাস করাচ্ছেন তিনজন। এ পরিস্থিতি নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার সাদিপুর ইউনিয়নের ৩৯ নং কাজহরদী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের। দুর্গম এলাকা হওয়ায় শিক্ষকরা থাকতে চান না এই স্কুলে। পদায়নের কিছুদিনের মধ্যেই বদলি হয়ে চলে যান। স্কুলটি প্রতিষ্ঠার ৫৫ বছরে কখনোই স্কুলে ৫ জনের বেশি শিক্ষক ছিলেন না। পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে স্কুলে শিক্ষক নিয়োগ, স্কুলগামী রাস্তার উন্নয়ন ও বিশেষ ব্যবস্থায় স্থানীয় বাসিন্দাদের স্কুলে চাকরি দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।  
কাগজপত্রে নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়া থেকে সোনারগাঁয়ের কাজহরদী ২৫ কিলোমিটার দূরে। কিন্তু যেতে সময় লাগে দেড় ঘণ্টার বেশি। যদিও একই সময়ে নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়া থেকে মুন্সীগঞ্জের মাওয়াতে পৌঁছানো যায়। এর কারণ হচ্ছে নারায়ণগঞ্জ থেকে কাজহরদী যাওয়ার উপায়টি বেশ কঠিন। চাষাঢ়া থেকে যেতে হলে প্রথমে সাইনবোর্ড নেমে সেখান থেকে অন্য কোনো যানবাহনে কেওঢালা নামতে হবে। কেওঢালা থেকে আবার অটোরিকশা বা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে যেতে হবে কাজহরদী। 

কাজহরদী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম ও প্রথম শ্রেণিতে দুই সন্তান পড়ে মোহাম্মদ দীন ইসলামের। তিনি জানান, কেওঢালা থেকে কাজহরদী পর্যন্ত রাস্তার পাশে রয়েছে ১২টি ইটভাটা। এসব ইটভাটায় যাতায়াতকারী ট্রাকের কারণে স্কুলগামী রাস্তা দ্রুত ভেঙে যায়। আসতে যেতে রাস্তার ঝাঁকিতে শরীরের অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। এ ছাড়া স্কুল থেকে আসা-যাওয়ার সময় যানবাহন খুব কম পাওয়া যায়। বৃষ্টি হলে রাস্তার অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায়। 

স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির আরেক শিক্ষার্থীর অভিভাবক কাজহরদী এলাকার বাসিন্দা মোস্তফা হোসেন জানান, প্রাক-প্রাথমিক থেকে ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত ৬টি শ্রেণিতে এই স্কুলে ৩১৩ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। তাদের জন্য স্কুলে রয়েছেন মোট চারজন শিক্ষিকা। তাদের মধ্যে একজন মাতৃত্বকালীন ছুটিতে থাকায় বর্তমানে স্কুলে শিক্ষাদানে নিয়োজিত আছেন মাত্র ৩ জন। সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত প্রাক-প্রাথমিক থেকে ক্লাস টু পর্যন্ত ক্লাস হয়। দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত চলে তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির ক্লাস। মাত্র তিনজন শিক্ষিকা টানা ক্লাস করাতে করাতে ক্লান্ত হয়ে যান। ফলে বিকেলের অংশে তারা শুধু পড়া দেওয়া ও নেওয়ার কাজটি কোনোরকমে করেন। 

স্কুলটির অবস্থান সোনারগাঁয়ে হলেও কাগজে কলমে এখনও বন্দর উপজেলায় রয়ে গেছে। ফলে স্কুলটির তদারকির অভাব রয়েছে। স্কুলের এক ছাত্রীর অভিভাবক সোহেল মিয়া জানান, স্কুলটি ১৯৭১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এখন পর্যন্ত এই স্কুলের আশপাশে কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে আর কোনো স্কুল নেই। ফলে পার্শ্ববর্তী ১০-১৫টি গ্রামের শিক্ষার্থীরা এখানেই লেখাপড়া করতে আসে। ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর প্রধান শিক্ষক দুলাল মিয়া বদলি হয়ে চলে যাওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত এই স্কুলে আর কোনো প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়নি। স্কুলের সিনিয়র শিক্ষিকা মমতাজ আক্তার ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব পালন করছেন। স্কুলে ৭ জন শিক্ষকের পদ থাকলেও স্কুল প্রতিষ্ঠার পর থেকে আজ পর্যন্ত ৫৫ বছরে ৫ জনের বেশি শিক্ষক কখনোই ছিল না। বর্তমানে যে ৩ জন শিক্ষিকা ক্লাস নিচ্ছেন, তাদের মধ্যে একজনের বদলির আদেশ হয়ে আছে। বর্তমানে ৩ জন শিক্ষিকাকে সব ক্লাস চালাতে হচ্ছে, এতে শিক্ষিকাদের দক্ষতা কমে যাচ্ছে, পাঠদান কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে এবং শিক্ষার্থীরা কাঙ্ক্ষিত ফলাফল করতে পারছে না। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শিক্ষিকা জানান, নারায়ণগঞ্জ শহর, বন্দর উপজেলা সদর ও সোনারগাঁ উপজেলা সদর এই তিন জায়গা থেকেই এই স্কুলের দূরত্ব অনেক। যাতায়াত খরচ শুকনো দিনে মাসে ছয় হাজার টাকা লাগে। বৃষ্টির দিনে এ খরচ আট হাজার টাকার বেশি হয়ে যায়। ফলে দূরের শিক্ষকরা এখানে আসতে আগ্রহী হন না। নিয়োগ পেলেও কিছুদিন পর তারা বদলি হয়ে চলে যান, ফলে শিক্ষকের ঘাটতি থেকে যায়। তা ছাড়া ক্লাস করার পাশাপাশি সরকারি নির্দেশে বিভিন্ন অফিসিয়াল কাজও তাদের করতে হয়। 
স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা মমতাজ আক্তার বলেন, আমরা আমাদের যথাসাধ্য চেষ্টা করছি। তবে পর্যাপ্ত শিক্ষক প্রয়োজন। পদ অনুযায়ী শিক্ষক পেতে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও বন্দর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে আমি নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে যাচ্ছি। এ মাসেই সরকারিভাবে শিক্ষক নিয়োগ সম্পন্ন হওয়ার কথা।
বন্দর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আজমল হোসেন বলেন, যোগাযোগের সমস্যার কারণে স্কুলটিতে শিক্ষকরা থাকতে চান না। আশপাশেও স্কুল নেই যে, সেখান থেকে শিক্ষক এনে আমরা এখানে দেব। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানিয়েছি। এরপরও দু-এক দিনের মধ্যে স্কুল পরিদর্শন করে সেখানে কী করা যায় দেখব।

আরও পড়ুন

×