ঢাকা মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬

তলিয়ে যাওয়া ধান দেখে কৃষকের মৃত্যু

একদিকে স্বামীর ঋণের চিন্তা, অন্যদিকে সন্তানদের ভবিষ্যৎ

একদিকে স্বামীর ঋণের চিন্তা, অন্যদিকে সন্তানদের ভবিষ্যৎ
×

নাসিরনগরে জমিতে মারা যাওয়া কৃষক আহাদের তিন ছেলেমেয়ে। ছবি: সমকাল

নাসিরনগর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৬ | ১১:০৫ | আপডেট: ০৪ মে ২০২৬ | ১১:০৫

খুব সকালে কয়েকজন শ্রমিক নিয়ে জমিতে গিয়েছিলেন আহাদ মিয়া। পাকা ধান কাটার কথা ছিল সেদিন। কিন্তু জমিতে পৌঁছে তিনি দেখেন, চারদিকে অথৈ পানি। কোমরপানিতে দাঁড়িয়ে চোখের সামনে পাকা ধান ডুবতে দেখেন তিনি। কিছুক্ষণ এভাবেই নিশ্চুপ তাকিয়ে ছিলেন। হঠাৎ লুটিয়ে পড়েন জমির পাশে। কিছুক্ষণের মধ্যে জমির পাশেই তাঁর মৃত্যু হয়। একই সঙ্গে অনিশ্চয়তায় পড়ে তাঁর পুরো পরিবার।

আহাদের বাড়ি নাসিরনগরের গোয়ালনগর ইউনিয়নের রামপুর গ্রামে। পেশায় কৃষক হলেও পুরোনো জামাকাপড় সংগ্রহ করে বিক্রি করে চলত তাঁর সংসার। থাকার জায়গা হিসেবে পৈতৃক সূত্রে পাওয়া এক শতক জমির ওপর একটি ছোট্ট ভাঙা টিনের ঘর। স্ত্রীসহ তিন সন্তান নিয়ে সেখানে বসবাস করতেন আহাদ। বাড়ি পাশে মেদির হাওরে এক বিঘা জমি আছে তাদের। সেই জমির ধান দিয়েই বছরের খাবার চলে। একটু ভালো চলার জন্য এ বছর স্থানীয়দের কাছ থেকে টাকা দিয়ে হাওরের আরও পাঁচ বিঘা জমি বর্গা নিয়ে আবাদ করেছিলেন। জমি চাষাবাদ করতে গিয়ে এলাকার কয়েকজনের কাছ থেকে টাকাও ধার করেছিলেন। যার পরিমাণ প্রায় ৯০ হাজার টাকা। চেয়েছিলেন, ঘরে পাকা ধান এলে তা বিক্রি করে ধারের টাকা পরিশোধ করবেন। কিন্তু টানা বৃষ্টি আর উজানের ঢল তাঁর ছয় বিঘা জমির পাকা ধান পানির নিচে তলিয়ে যায়। 

গত শনিবার দুপুরেই স্থানীয় একটি কবরস্থানে আহাদের দাফন সম্পন্ন হয়। তাঁর ঘরে এখন কেবলই কান্না। স্ত্রী খুসনাহার বেগম তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা। বাড়িতে তিনটি ছোট সন্তান। বড় ছেলে শাহাজুল মিয়ার বয়সও সাত বছর। সে রামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী। ছোট ছেলে লিটন মিয়া (৫) এখনও ভালোভাবে কথা বলাই শেখেনি। আর মেয়ে নুসরাতের বয়স তিন বছর। তিন অবুঝ সন্তান আর অনাগত সন্তানের ভবিষ্যতের চিন্তার পাশাপাশি স্বামীর ঋণ কীভাবে শোধ করবেন, সেটাই এখন খুসনাহারের বড় চিন্তা।

কেবল আহাদ নন, পাকা ধান তলিয়ে যেতে দেখে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন গোয়ালনগর ইউনিয়নের সোনাতলা গ্রামের আরও দুই কৃষক। একজন মো. নজরুল মিয়া এবং অপরজন হলেন মো. মিজান মিয়া। নজরুল বর্গা নিয়ে পুটিয়া বিলে চার বিঘা জমিতে ধান আবাদ করেছেন আর তিন বিঘা জমিতে করেন বাদাম চাষ। এর মধ্যে তিনি একটি এনজিও থেকে এক লাখ টাকা ঋণ নিয়েছেন আর ৫০ হাজার টাকা ধার করেছেন।

নজরুল মিয়া বলেন, ‘আমার বাড়ি গাঙের পার। এর পাশেই পুটিয়া বিল। এই বিলে চার বিঘা জমিতে ব্রি ২৯ ধান চাষ করছিলাম। আর গাঙের (নদী) পাশে চরে তিন বিঘা জমিতে বাদাম চাষ করেছিলাম। গত শনিবার কামলা (শ্রমিক) নিয়া গেছিলাম ধান কাটতাম। জমিতে পানি দেখে কামলারা চইলা যায়। আমি কিছুক্ষণ দাঁড়াই থাকার পর অজ্ঞান হয়া যাই। এর পর আর কিছু কইতাম পারি না।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমারত সব শেষ। এখন এনজিওর কিস্তি দিমু কেমনে, আর পরিবার নিয়াইবা সারা বছর কেমনে চলুম!’

অপর কৃষক মিজান মিয়া শুষ্ক মৌসুমে অন্যের জমিতে শ্রমিকের কাজ করেন। পৈতৃকভাবে পাওয়া ছয় বিঘা জমিতে ধান আবাদ করেছিলেন। সেই জমি আবাদ করতে এনজিও থেকে প্রথমবার ৮০ হাজার টাকা ঋণ নেন। পরে আরও ৫০ হাজার টাকা ঋণ নেন। তিনি গত সপ্তাহে দুই বিঘা জমির ধান কাটতে পেরেছেন। কিন্তু টানা বৃষ্টির কারণে সেই ধানও পচে গেছে। বাকি চার বিঘা জমির ধান তলিয়ে গেছে। তাঁর দুই ছেলে, দুই মেয়ে। তাদের মধ্যে তিনজন মাদ্রাসায় পড়ালেখা করে। আর ছোট ছেলে সোনাতলা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশু শ্রেণির শিক্ষার্থী।

আরও পড়ুন

×