পাবনার ঈশ্বরদী
সংকট কাটেনি জ্বালানি তেলের ফসল উৎপাদনে ধসের শঙ্কা
ঈশ্বরদী (পাবনা) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৬ | ১১:২৭
লিচুর জন্য খ্যাত পাবনার ঈশ্বরদীতে এবার জ্বালানি তেলের সংকট, মূল্যবৃদ্ধি ও তীব্র তাপদাহে লিচুর উৎপাদনে বড় ধরনের ধসের আশঙ্কা করছেন কৃষকরা। এতে উপজেলার প্রায় ৩৭ হাজার কৃষক প্রচণ্ড উদ্বিগ্ন। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় লাভ তো দূরের কথা, লোকসানের শঙ্কায় দিন কাটছে তাদের।
তেল সংকট ও তাপদাহ অব্যাহত থাকলে শুধু লিচুই নয়, পুরো কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এর প্রভাব স্থানীয় অর্থনীতিতেও পড়বে বলে মনে করছেন তারা।
কৃষকদের অভিযোগ, একদিকে তীব্র গরম ও লোডশেডিংয়ে সেচ ব্যয় কয়েকগুণ বেড়েছে, অন্যদিকে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকটে কৃষিকাজ ব্যাহত হচ্ছে। সেচ, পরিবহন, জমি প্রস্তুত–সব ক্ষেত্রেই তেলের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় খরচ বেড়ে যাচ্ছে লাগামহীনভাবে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শ্রমিকের বাড়তি মজুরি।
ঈশ্বরদী কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলায় ১৭ হাজার ৮৮৯ হেক্টর জমিতে ধান, গম, সরিষা, সবজি, লিচুসহ বিভিন্ন ফলের আবাদ করেন প্রায় ৩৭ হাজার কৃষক। এসব জমিতে সেচ দেওয়া, ফসল তোলা ও পরিবহনে জ্বালানি অপরিহার্য। কিন্তু তেলের দাম বৃদ্ধি ও সংকটে কৃষকদের চাষাবাদে ছন্দপতন ঘটেছে।
কৃষকরা জানান, বোরো ধান পাকার সময় ঘনিয়ে এলেও পর্যাপ্ত সেচ দিতে পারছেন না। ফলে ফলন কম হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। একই অবস্থা লিচুবাগানেও। তীব্র গরমে লিচুর গাছ রক্ষায় নিয়মিত পানি দিতে হচ্ছে। তেলের অভাবে তা সম্ভব হচ্ছে না।
ঈশ্বরদী আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, এলাকায় মাঝারি তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠেছে, যা লিচুসহ অন্যান্য ফসলের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
মানিকনগর গ্রামের কৃষক আমিরুল ইসলাম সরদার বলেন, ‘তেলের দাম বাড়ায় শ্রমিক সংকটও দেখা দিয়েছে। আগে ৬০০ টাকায় কাজ করা শ্রমিকরা এখন ৬৫০ টাকা দাবি করছেন। যাতায়াত খরচ বেড়ে যাওয়ায় তাদের মজুরি বাড়াতে হচ্ছে।’
সাহাপুর ইউনিয়নের গড়গড়ি গ্রামের লিচুচাষি দুর্জয় ইসলাম বলেন, ‘গাছে লিচু ভালোই ধরেছে। তাপদাহে গাছ বাঁচাতে প্রতিদিন সেচ দিতে হচ্ছে। তেলের অভাবে সেই সেচ দেওয়া কঠিন হয়ে গেছে।’
জয়নগর বোর্ডঘর লিচুহাট আড়তদার সমিতির সভাপতি সানাউল হক বলেন, জ্বালানি সংকটে গাছে সময়মতো সেচ দেওয়া যাচ্ছে না। এতে লিচুর ফলন কম হবে। কৃষকরা লাভবান নাও হতে পারেন। একই কথা বলেন শিমুলতলা লিচুহাট আড়তদার সমিতির সভাপতি মো. চাঁদ আলী। তাঁর ভাষ্য, পরিচর্যা করা না গেলে লিচুর মান খারাপ হবে। এতে পাইকারদের মোকামে আসার আগ্রহ কমে যাবে। লোকসানে পড়বেন আড়তদার, ব্যবসায়ী ও চাষি উভয়ই।
স্থানীয় একটি সমিতি থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে লিচুর আবাদ করেছিলেন মানিকনগর গ্রামের কৃষক আবেদ আলী প্রামাণিক। গুটিও এসেছিল বেশ। আশা করেছিলেন দুই থেকে তিন লাখ টাকা লাভ হবে; কিন্তু জ্বালানি সংকট ও তাপদাহে ফলনে প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ আব্দুল মমিন বলেন, ‘সেচের জন্য বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দুটোই জরুরি। বর্তমানে কৃষকরা দুটোরই সংকটে পড়েছেন। আমরা কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ডের মাধ্যমে তেল প্রাপ্তি সহজ করার চেষ্টা করছি এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছি।’
- বিষয় :
- পাবনা
