ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

দাদা-দাদির কবরের পাশে সমাহিত লিমন

দাদা-দাদির কবরের পাশে সমাহিত লিমন
×

জামিল আহমেদ লিমন

কূটনৈতিক প্রতিবেদক ও জামালপুর প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৬ | ২১:৩৯

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় হত্যার শিকার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমনের মরদেহ আজ সোমবার সকালে দেশে পৌঁছেছে। সন্ধ্যায় জানাজা শেষে জামালপুরের মাদারগঞ্জের লালডোবা গ্রামে বাড়ির আঙিনায় দাদা-দাদির কবরের পাশে তাঁর মরদেহ দাফন করা হয়। 

নিহত আরেক শিক্ষার্থী নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির জানাজা আগামী বুধবার ফ্লোরিডায় অনুষ্ঠিত হবে। পরদিন তাঁর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে। 

জামিল আহমেদ লিমনের (২৭) বাড়ি মাদারগঞ্জে হলেও ছোটবেলা থেকে মা-বাবার সঙ্গে ঢাকার কেরানীগঞ্জে থাকতেন। মাঝে গাজীপুরের মাওনাতেও তারা থেকেছেন। তিনি ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডায় (ইউএসএফ) ভূগোল, পরিবেশিবজ্ঞান ও নীতি বিষয়ে পিএইচডি করছিলেন। ২০২৩ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছিলেন তিনি। 

আজ বেলা সোয়া ৩টার দিকে লালডোবা গ্রামে বাড়ির আঙিনায় লিমনের মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্সটি পৌঁছায়। এর আগে থেকেই তাঁকে একনজর দেখার জন্য সেখানে শত শত মানুষ ভিড় করেন। এ সময় শোকের পাশাপাশি মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। লিমনের মরদেহ দেখে স্বজনদের অনেকে চিৎকার করে কেঁদে ওঠেন। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কাছে লিমনের নৃশংস হত্যাকারীকে গ্রেপ্তার ও ফাঁসির দাবি জানান নিহতের স্বজন ও এলাকাবাসী। মাগরিবের নামাজের পর লালডোবা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে জানাজা শেষে বাড়ির আঙিনায় দাদা-দাদির পাশে তাঁকে দাফন করা হয়। 

লিমনের কফিন দেখার পর তাঁর মা লুৎফুন্নেছা কিছুটা স্তব্ধ হয়ে যান। একপর্যায়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‌‘যে বিমানবন্দর থেকে উচ্চশিক্ষার জন্য ছেলেকে বিদেশ পাঠিয়েছিলাম সে বিমানবন্দর থেকেই ছেলের কফিনবন্দি লাশ গ্রহণ করতে হলো।’ 

বাবা জহুরুল হক কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‌‘দুই ছেলের মধ্যে লিমন বড়। ছোট বেলা থেকেই সে অনেক মেধাবী ছিল। তাকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করতে অনেক স্বপ্ন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়েছিলাম। সে স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হলো। বাবা হয়ে বহন করতে হলো ছেলের লাশ।’

নিহতের চাচা সুজন মিয়া বলেন, ‘‌ছোটবেলা থেকেই লিমন ছিল অত্যন্ত মেধাবী। স্বপ্ন ছিল সে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে আমাদের মুখ উজ্জ্বল করবে। তার মর্মান্তিক মৃত্যুতে সব স্বপ্নই ধূলিসাৎ হয়ে গেছে।’

স্থানীয় মসজিদের ইমাম মাওলানা তৈয়ব আলী বলেন, ‌এলাকার মানুষের প্রতি লিমনের অগাধ ভালোবাসা ছিল। সময় পেলে গ্রামে চলে আসতেন বেড়াতে। তাঁর এমন নৃশংস মৃত্যু এলাকাবাসী মেনে নিতে পারছে না। 

এদিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সকালে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সরকারের পক্ষে লিমনের মরদেহ গ্রহণ করেন। এরপর বিমানবন্দরে উপস্থিত লিমনের পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করেন। মরদেহ গ্রহণ এবং হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সার্বিক সহযোগিতা দিয়েছে।

মরদেহ হস্তান্তরের সময় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে বলে জানান। যুক্তরাষ্ট্র এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত সম্পন্ন করবে এবং হত্যাকাণ্ডে দায়ীদের উপযুক্ত শাস্তির আওতায় আনবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। সরকার নিহত দুই শিক্ষার্থীর পরিবারের পাশে আছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ অনুযায়ী নিহত দুই শিক্ষার্থীর পরিবারের প্রতি সরকারের প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দেন শামা ওবায়েদ।

লিমনের মরদেহ গত ২ মে সন্ধ্যায় ফ্লোরিডার অরল্যান্ডো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে দেশে পাঠানো হয়। মায়ামিতে বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেলের কনসাল জেনারেল ও কনসাল সেখানে উপস্থিত থেকে এ প্রক্রিয়া তদারকি করেন। নিহত লিমনের জানাজার নামাজ গত ৩০ এপ্রিল টাম্পার ইস্তাবা ইসলামিক সোসাইটি অব টাম্পা বে এরিয়া মসজিদে অনুষ্ঠিত হয়।

হত্যার শিকার ইউএসএফের আরেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির মরদেহ শনাক্তের খবর গত ১ মে হিলসবোরো কাউন্টির শেরিফ অফিস থেকে নিশ্চিত করে। এর পরপরই সেখানকার বাংলাদেশ কনস্যুলেট তাঁর মরদেহ দেশে পাঠাতে পরিবারের কাছ থেকে সম্মতি নিয়ে পিনালেস কাউন্টির মেডিকেল এক্সামিনারকে মরদেহ ফিউনারেল হোমের কাছে হস্তান্তরের জন্য অনুরোধ জানায়। ৬ মে স্থানীয় প্রবাসী বাংলাদেশিদের অংশগ্রহণে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। ৭ মে তাঁর মরদেহ দেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। 

লিমন ফ্লোরিডা শহরের ভাড়া বাসা থেকে গত ১৬ এপ্রিল নিখোঁজ হন। ২৪ এপ্রিল ওই শহরের একটি ব্রিজের নিচ থেকে তাঁর ক্ষত-বিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। 

আরও পড়ুন

×