ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

শিল্পকর্ম

জীবন্ত সংগ্রহশালা ‘চারুকুঠি’

জীবন্ত সংগ্রহশালা ‘চারুকুঠি’
×

শিশু-কিশোরদের সঙ্গে নিয়ে ছবি আঁকছেন ধর্মদাস মল্লিক। গত শুক্রবার নড়াইল সদর উপজেলার শিমুলিয়া গ্রাম থেকে তোলা সমকাল

 নড়াইল সংবাদদাতা

প্রকাশ: ০৫ মে ২০২৬ | ০৮:৪৮ | আপডেট: ০৫ মে ২০২৬ | ০৯:১২

| প্রিন্ট সংস্করণ

নড়াইল সদর উপজেলার ছোট্ট গ্রাম শিমুলিয়া। গ্রামটিতে ঢুকতেই চোখে পড়ে একটি সাইনবোর্ড, তাতে লেখা ‘চারুকুঠি’; যেটি একটি একতলা বাড়ি।

ভেতরে ঢুকলে বোঝা যায়, এটি সাধারণ বাড়ি নয়; যেন শিল্পীর তুলিতে আঁকা জীবন্ত এক সংগ্রহশালা। বাড়ির প্রতিটি কোণেই শিল্পের ছোঁয়া। দেয়ালে টাঙানো ছবির পাশাপাশি রয়েছে টেরাকোটার কাজ, ছোট ছোট ভাস্কর্য এবং গ্রামীণ জীবনের পুরোনো  তৈজসপত্র।

বাড়িটির মালিক চিত্রশিল্পী ধর্মদাস মল্লিক। তিনি জানালেন, তাঁর আঁকা শতাধিক ছবি বাড়ির দেয়ালে টাঙানো রয়েছে। জায়গার অভাবে হাজারের বেশি ছবি টাঙাতে পারেননি। অনেক ছবি বৃষ্টির ছাঁটে নষ্ট হচ্ছে, কিছু পড়ে থেকে ক্ষয়ে যাচ্ছে। রাখার জায়গা না থাকায় বড় ছবি আঁকতে পারছেন না।

ধর্মদাস মল্লিক কিংবদন্তি চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের শিষ্য। তাঁর বাবার নাম সরোজ মল্লিক, মায়ের নাম সুমিত্রা মল্লিক। ঢাকায় দুই দশকের বেশি সময় কাটিয়েছেন চিত্রশিক্ষা, প্রদর্শনী ও পেশাগত কাজে। খুলনা আর্ট কলেজ থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম চারুকলা ইনস্টিটিউট, পরে নারায়ণগঞ্জ চারুকলা ইনস্টিটিউট এবং সবশেষ ঢাকার ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভ থেকে এমএফএ (চারুকলায় স্নাতকোত্তর) ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি।

গত শুক্রবার গিয়ে দেখা যায়, ছাদে দাঁড়িয়ে ছবি আঁকছেন ধর্মদাস। চারপাশে শিশু-কিশোররা নিজেদের মতো করে ছবি আঁকছে। জানা গেল, প্রতি শুক্রবার প্রায় অর্ধশত শিশু-কিশোর আসে তাঁর কাছে ছবি আঁকা শিখতে। তিনি এই শিল্প বিদ্যালয়ের নাম দিয়েছেন ‘চারুকুঠি শিল্পালয়’। ২০২০ সাল থেকে চলছে বিনামূল্যের এই পাঠশালা।
ধর্মদাস মল্লিক বলেন, ‘ঢাকায় থাকতে থাকতে একসময় মনে হলো, শহরের কংক্রিট জীবনে দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিলাম, গুরু সুলতানের মতো আমিও গ্রামে ফিরে শিশু-কিশোরদের বিনা পয়সায় ছবি আঁকা শেখাব। সেই ভাবনা থেকেই চারুকুঠি শিল্পালয়ের যাত্রা শুরু।’

এসএম সুলতানের কাছে যেভাবে ছবি আঁকা শিখেছিলেন, সেভাবেই শিশুদের শেখানোর চেষ্টা করেন ধর্মদাস। চারুকুঠি তাঁর কাছে শুধু আঁকার জায়গা নয়; প্রকৃতি ও জীবনের পাঠশালা। তিনি বলেন, শিশুদের মাটির গন্ধ, সূর্যের তাপ, বৃষ্টির ছোঁয়া অনুভব করাতে হবে। তাই এখানে তারা শুধু ছবি আঁকা শেখে না; চাষ করে, ফসল ফলায়, মাছের পোনা ছাড়ে। প্রতি শনিবার ‘এসো কাজ শিখি’ নামে বিশেষ ক্লাস হয় চারুকুঠিতে; যেখানে বাগান পরিচর্যা, জীববৈচিত্র্য বোঝা ও প্রকৃতিকে জানার সুযোগ পায় শিক্ষার্থীরা।

প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে ছবি আঁকা শুরু করেন ধর্মদাস। একবার এক প্রতিবেশী তাঁর একটি কবুতর মেরে ফেলেছিলেন। সেই অন্যায় গভীর দাগ কেটেছিল কিশোর ধর্মদাসের মনে। তিনি মাটির ঘরের দেয়ালে আঁকলেন মৃত কবুতরের ছবি, নিচে লিখলেন জীব হত্যা মহাপাপ, নরকে গমন। সেই থেকেই ছবি হয়ে ওঠে তাঁর প্রতিবাদের হাতিয়ার।
একদিন এক মামাতো ভাইয়ের মাধ্যমে চিত্রশিল্পী এসএম সুলতানের কথা জানতে পারেন ধর্মদাস। ছুটে যান তাঁর কাছে। স্মৃতি রোমন্থন করে ধর্মদাস বলেন, ‘প্রথমবার গিয়ে গুরুর সঙ্গে দেখা হয়নি। দ্বিতীয়বার ১৪ কিলোমিটার হেঁটে গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা হয়। গুরুর আঁকা বিশাল মানবমূর্তি দেখে হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। মনে হয়েছিল, এমনটাই তো আমি আঁকতে চাই! সেদিন থেকেই শুরু হয় গুরুর কাছে শেখা। সাত বছর শিখেছি তাঁর কাছে। জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি সেটাই।’

সব শেষে, গুরু এসএম সুলতানকে স্মরণ করে ধর্মদাস বলেন, বেঁচে থাকতে সুলতানের কদর ছিল না। মৃত্যুর পর তাঁর দাম বেড়েছে। কোনো একদিন হয়তো তাঁর স্বপ্নও পূরণ হবে। আর সেই আশা নিয়েই কাজ করে যাচ্ছেন এই গুণী।
 

আরও পড়ুন

×