দুই দফা মারধর, ৪০ হাজার টাকা দাবি করা হয় পরিবারের কাছে
কৃষ্ণ রাজবংশী
মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬ | ০৭:৫৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
মানিকগঞ্জের তরা বাজারে কৃষ্ণ রাজবংশীকে পিটিয়ে হত্যা করে লাশ ঝুলিয়ে রাখার অভিযোগ তুলেছে তার পরিবার। তাদের দাবি, বুধবার ওই ঘটনার আগে ৪০ হাজার টাকা দাবি করেছিলেন বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটির লোকজন। দরিদ্র পরিবারটি ওই টাকা দিতে পারেনি। এই কারণে দ্বিতীয় দফা মারধর করে তাঁকে আটকে রাখা হয়। পরে সন্ধ্যার দিকে পুলিশ বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটির কার্যালয় থেকে কৃষ্ণের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে। এ ঘটনায় গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নিহতের স্ত্রী যমুনা রাজবংশী মানিকগঞ্জ থানায় একটি মামলা করেছেন।
নিহত কৃষ্ণ রাজবংশী মানিকগঞ্জ পৌর এলাকার বান্দুটিয়া মাঝিপাড়া মহল্লার ক্ষুদিরাম রাজবংশীর ছেলে। তিনি বিভিন্ন ব্যক্তির জলাশয়ে জাল টানা ও মাছ ধরার কাজ করতেন। মাঝেমধ্যে তরা বাজারে ট্রাক থেকে মাছ নামানোর শ্রমিকের কাজও করতেন। তাঁর ১৭ বছর বয়সী এক ছেলে ও ১৩ বছর বয়সী এক মেয়ে রয়েছে।
নিহতের স্ত্রী যমুনা রাজবংশী বলেন, মাছ চুরির সন্দেহে তাঁর স্বামী কৃষ্ণকে বুধবার সকালে তরা বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটির কার্যালয়ে মারধর করে আটকে রাখেন কমিটির লোকজন। এরপর সকাল সাড়ে ৯টার দিকে মোটরসাইকেলে করে দুজন ব্যক্তি তাদের বাড়িতে আসেন। স্বামীকে ছাড়িয়ে আনতে ৪০ হাজার টাকা নিয়ে যেতে বলেন। কিন্তু ওই টাকা যোগাড় করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। পরে তিনি স্বামীকে ছাড়িয়ে আনতে তরা বাজারে ওই কার্যালয়ে যান। তিনি যাওয়ার পরও তাঁর স্বামীকে মারধর করেন কমিটির লোকজন। যমুনা রাজবংশী বলেন, তাদের পায়ে ধরেছি, তারপরও আমার স্বামীরে মারধর করেছে। আমি ওদের বলেছিলাম, চুরি যদি করে থাকে তবে মারধর না করে পুলিশে দেন। কিন্তু ওরা আমার স্বামীকে মেরে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখে। আমি এখন দুই সন্তান নিয়ে কোথায় যাব। আমার স্বামীকে যারা মেরেছে আমি তাদের শাস্তি চাই।
নিহতের ছোট ভাই বিষ্ণু রাজবংশী বলেন, আমার দাদাকে তরা বাজারের কমিটির লোকজন ধরে মারধর করে হাত পা ভেঙে ফেলেছিল। এত ওপরের ফ্যানের সঙ্গে গামছা পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করার শক্তি তাঁর ছিল না। বাজারের লোকজন মেরে আত্মহত্যা বলে চালাতে চাচ্ছে। আমি এই হত্যাকাণ্ডের সঠিক তদন্ত করে আসামিদের শাস্তি চাই।
নিহত কৃষ্ণের মাসতুতো ভাই লালচান রাজবংশী বলেন, কৃষ্ণকে ছেড়ে দিতে ৪০ হাজার টাকা দাবি করে কমিটির লোকজন। টাকা দিতে না পারায় মারধর করে তাকে হত্যা করা হয়েছে।
জানা গেছে, বুধবার সকালে মাছ চুরির সন্দেহে কৃষ্ণ রাজবংশীসহ দুজনকে আটক করে তরা বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটির লোকজন। একজনকে কমিটির সদস্যদের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হলেও কৃষ্ণকে মারধর করে কমিটির কার্যালয়ে আটকে রাখা হয়। দুপুরে ওই কার্যালয়ের ভেতরে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত লাশ দেখতে পান স্থানীয় লোকজন। তখন বাজার কমিটির কয়েকজন সদস্যরা মরদেহটি সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে স্থানীয়দের বাঁধার মুখে তারা ঘটনাস্থল থেকে চলে যান। পরে সন্ধ্যার দিকে পুলিশ কৃষ্ণের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। ময়নাতদন্ত শেষে গতকাল দুপুরে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
এ ঘটনার পর তরা বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি মো. ইব্রাহিমসহ কমিটির লোকজন গা ঢাকা দিয়েছেন। তাদের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করলেও তারা ধরেননি।
তরা বিল্টু স্মৃতি হাটবাজারের উপদেষ্টা হারুনুর রশিদ বলেন, আমি বুধবার বেলা ১১টার দিকে বাজারে এসে দেখতে পাই সমিতির ঘরের নিচতলায় মাছ চুরির অভিযোগে কৃষ্ণ রাজবংশীকে হাত বেঁধে আটকে রাখা হয়েছে। কয়েক দিন আগে ছয় কার্টন চিংড়ি মাছ চুরি হয়েছিল। এই কারণে কৃষ্ণকে ৪০ হাজার টাকা দেওয়ার জন্য আটকে রাখা হয়েছিল বলে আমাকে জানানো হয়। আমি বলেছিলাম পরিবারের লোকজন এনে তাঁকে ছেড়ে দিতে। পরে রাতে জেনেছি কৃষ্ণ রাজবংশী নাকি আত্মহত্যা করেছে।
এ বিষয়ে সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইকরাম হোসেন বলেন, মাছ চুরির অভিযোগে কৃষ্ণকে আটকে রেখে মারধর করা হয়। পরে তিনি ফাঁস নিয়ে আত্মহত্যা করেছেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে ময়নাতদন্ত শেষে লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। নিহতের স্ত্রী যমুনা রাজবংশী বাদী হয়ে সন্ধ্যার পর একটি মামলা করেছেন।
- বিষয় :
- মারধর
