পানির নিচে সড়ক, ঝুঁকি নিয়ে হাওরের ধান পরিবহন
তলিয়ে যাওয়া সড়কে ফেরি থেকে ঝুঁকি নিয়ে নামছে ধানবোঝাই ট্রাক্টর। রোববার কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার চামটা বন্দরে সমকাল
কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৯ মে ২০২৬ | ০৮:১৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
কয়েক দিনের টানা ভারী বর্ষণ আর ঢলে কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার চামটা নৌ বন্দরের ফেরিঘাট এখন ঝুঁকিপূর্ণ জলপথে পরিণত হয়েছে। ফেরির পন্টুনে ওঠানামার রাস্তা প্রায় ২ ফুট পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় ধানবোঝাই ট্রাক-ট্রাক্টরসহ সব ধরনের যানবাহনকে চরম ঝুঁকি নিয়ে পারাপার করতে হচ্ছে। তবুও হাওরের বোরো ধান পরিবহন বন্ধ করা যাচ্ছে না। কারণ এই ফেরিঘাটই এখন হাওরাঞ্চলের হাজারো কৃষকের একমাত্র ভরসা।
শুষ্ক মৌসুমে কিশোরগঞ্জের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে হাওরাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ পথ এই চামটা নৌ বন্দর। বিশেষ করে বোরো ধান কাটার মৌসুমে ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম অঞ্চলের ধান পরিবহনে ফেরিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফেরির রাস্তা ডুবে যাওয়ায় কৃষকসহ এ পথ ব্যবহারকারীদের দুর্ভোগের মাত্রা বেড়েছে।
এদিকে ফেরিঘাট এলাকায় কোনো সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড, নিরাপত্তা ব্যবস্থা বা ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ নেই। ফলে প্রতিদিন শত শত যানবাহন ঝুঁকি নিয়েই চলাচল করছে।
সরেজমিন দেখা যায়, চামটা নৌ বন্দরের ফেরিঘাটে যানবাহনের দীর্ঘ সারি। পানির নিচে তলিয়ে থাকা কাঁচা রাস্তায় আন্দাজের ওপর ভর করে ধান বোঝাই ট্রাক্টরগুলো ফেরি থেকে নামছে। কোথাও চাকা কাদায় বসে যাচ্ছে, কোথাও হেলে পড়ছে ট্রলি। আতঙ্ক নিয়েই পারাপার করছেন চালক ও যাত্রীরা। বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে কৃষকদের। ধানের মৌসুমে তারা এ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন।
হাওরের কৃষকসহ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একদিকে তারা প্রাণপণ চেষ্টা করছেন কষ্টের ফসল ঘরে তুলতে, অন্যদিকে প্রশাসনও বাস্তবতার কাছে অনেকটাই অসহায়। ফলে চামটা নৌ বন্দরে এখন প্রতিটি ফেরি পারাপার যেন একেকটি ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে পরিণত হয়েছে। তাদের একটাই দাবি– দ্রুত নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হোক, যাতে জীবন ও ফসল রক্ষা পায়।
স্থানীয় ব্যবসায়ী আল আমিন, মাঈনুদ্দিন ও ইয়াসিন জানান, ফেরিঘাটের রাস্তা ডুবে যাওয়ার পর থেকে প্রায় প্রতিদিনই ছোটখাটো দুর্ঘটনা ঘটছে। ধানবোঝাই ট্রাক্টর কিংবা ট্রলি কাঁচা রাস্তায় আটকে গেলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফেরি চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এতে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। তারা বলেন, ‘এভাবে আর কয়েকদিন চললে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। ধানবাহী গাড়ি উল্টে গেলে শুধু ফসলের ক্ষতিই নয়, প্রাণহানির ঘটনাও ঘটতে পারে।’
ইটনা থেকে ধান নিয়ে আসা ট্রাকচালক আব্দুর রহমান বলেন, ‘ফেরি থেকে নামার সময় বোঝাই যায় না কোথায় রাস্তা আর কোথায় গর্ত। একটু এদিক-সেদিক হলেই গাড়ি কাদায় বসে যায়। জীবন নিয়ে চলাচল করছি।’
ইটনার বড়বাড়ি এলাকার কৃষক সাইদুর রহমান বলেন, ‘ধান ঘরে তোলার মৌসুম শুরু হয়েছে। এ অবস্থায় ফেরির রাস্তা ডুবে গেছে। মাঝে মধ্যে ভ্যানের চাকা আটকে যায়। ঝুঁকি থাকলেও বাধ্য হয়েই ধান পরিবহন করছি। তবে ফেরি বন্ধ হলে আমাদের সর্বনাশ হয়ে যাব।’
স্থানীয় সুতারপাড়া ইউপি চেয়ারম্যান কামাল হোসেন বলেছেন, বন্দরটি আমার ইউনিয়নে পড়লেও এর ব্যবস্থাপনা করে সড়ক ও জনপথ বিভাগ। কাজেই এ বিষয়ে আমার কিছু করার নেই। তবে জরুরি ভিত্তিতে ফেরিঘাট সংস্কার না করলে হাওরাঞ্চলের কৃষকরা বড় ক্ষতির মুখে পড়বেন।
জেলা সওজ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী শাকিল মোহাম্মদ ফয়সাল বলেন, সাধারণত এই সময়ে পন্টুনের রাস্তা ডুবে যায় না। কিন্তু এবার অস্বাভাবিক বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে এমন অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন স্থানে এমন পরিস্থিতিতে ফেরি চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিন্তু কিশোরগঞ্জে বোরো ধান পরিবহনের মৌসুম। তাই ফেরি বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। পানির গভীরতা কম থাকায় পন্টুন সরিয়েও নেওয়া যাচ্ছে না।’
- বিষয় :
- সড়ক
