ঢাকা সোমবার, ২২ জুন ২০২৬

সমন্বয়হীনতায় তালিকাবঞ্চিত প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা

সমন্বয়হীনতায় তালিকাবঞ্চিত প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা
×

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১০ মে ২০২৬ | ০৮:১০

| প্রিন্ট সংস্করণ

টানা বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলের ফলে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় এবার সিলেট অঞ্চলে সর্বনাশ হয়েছে বোরো চাষিদের। সুনামগঞ্জের পর এই অঞ্চলের সর্বোচ্চ বোরো ধানের আবাদকারী মৌলভীবাজারের কৃষকদেরও এবার ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে। এদিকে সরকারি সহায়তা দেওয়ার জন্য ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের যে তালিকা করা হয়েছে সেখানেও বঞ্চিত তাদের অনেকেই।

মৌলভীবাজারে হাওরের জলাবদ্ধতায় তলিয়ে যাওয়া ফসল সংগ্রহে ব্যর্থ কৃষকদের অনেকেই ফিরেছেন একেবারে শূন্য হাতে। হতভাগ্য এসব কৃষককে সরকারিভাবে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার লক্ষ্যে তালিকা করা হচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে, তালিকা প্রণয়নে প্রকৃতপক্ষে যে সব কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত তাদের অনেকেই রয়েছেন বঞ্চিতের কাতারে।

পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক সংশ্লিষ্ট পর্যায়ের একাধিক ব্যক্তির দাবি, কৃষি বিভাগ, স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ ও বিএনপির স্থানীয় পর্যায়ের নেতৃত্বের সমন্বয়হীনতায় সরকারের ভালো একটি উদ্যোগ প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে উঠেছে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ।
জানা যায়, মৌলভীবাজার জেলায় প্রধান তিনটি হাওর হাকালুকি, কাউয়াদিঘি ও হাইল হাওরসহ ছোট-বড় অনেক হাওর রয়েছে। এ সব হাওর পারের মানুষের প্রধান অবলম্বন বোরো ফসল। আগাম বৃষ্টির পানিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় হাওরের তিন ভাগের দুই ভাগ ফসল এবার ডুবে নষ্ট হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে সরকার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য তালিকা প্রস্তুতে কৃষি বিভাগকে নির্দেশ দিয়েছে।
নির্দেশনা অনুযায়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান-মেম্বার, স্থানীয় ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি-সম্পাদকের সঙ্গে সমন্বয় করে সরেজমিন ঘুরে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা তালিকা তৈরি করার কথা। কিন্তু বিভিন্ন ইউনিয়নে এই নির্দেশনা অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ ওঠেছে।

রাজনগর উপজেলায় সাড়ে সাত হাজার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা করার নির্দেশনা রয়েছে। সে অনুযায়ী কাউয়াদিঘিপারের ফতেপুর, পাঁচগাঁও ও উত্তরভাগ ইউনিয়ন থেকে অধিকাংশ ক্ষতিগ্রস্তের নাম নেওয়া হয়েছে। ব্যত্যয় ঘটেছে উপজেলার কড়াইয়া হাওরবেষ্টিত কামারচাক ইউনিয়নে। অভিযোগ রয়েছে, ওই ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের ফার্মেসিতে বসে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের জায়গায় ইচ্ছেমতো ব্যক্তিদের নাম তুলে নিয়েছেন; যা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান-মেম্বার কিংবা বিএনপি স্থানীয় কমিটির সভাপতির সঙ্গে সমন্বয় করা হয়নি।
এমন অভিযোগ তুলেছেন কামারচাক ইউনিয়ন বিএনপি সভাপতি আব্দুল খালিক। ওই ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মামুনুর রশীদ জানান, তাঁকে ৫০ জন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের নাম দিতে বলা হয়েছে। নামগুলো তিনি দিয়েছেন।

ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলতাফ হোসেন জানান- চেয়ারম্যান, মেম্বার, বিএনপির সভাপতির সঙ্গে আলোচনা করে সাড়ে ৩০০ ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা করা হয়েছে। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা শুভ্র নন্দী জানান, নিয়ম মেনে ৪৪৭ জন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কাছে পাঠানো হয়েছে।
রাজনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আল আমিন জানান, কামারচাক ইউনিয়নে তালিকা প্রণয়নে কিছু সমস্যার অভিযোগ উঠলেও পরে সমাধান হয়েছে। যদি সঠিকভাবে তালিকা না হয়ে থাকে তাহলে তদন্ত করে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

মৌলভীবাজার সদর উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের জন্য পাঁচ হাজার ক্ষতিগ্রস্তের তালিকা তৈরির নির্দেশনা আসে। সদর উপজেলার কাউয়াদিঘিপারের একাটুনা, আখাইকুঁড়া, হাইল হাওরপারের গিয়াসনগর ও নাজিরাবাদ ইউনিয়নের কৃষকরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এ উপজেলার অনেক ইউনিয়নে কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত নয় এমন অনেকের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মাঝে ক্ষোভ বিরাজ করছে।
সদর উপজেলার খলিলপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবু মিয়া চৌধুরী জানান, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা প্রণয়ন সম্পর্কে কোনো তথ্য জানা নেই। রাজনগর চা বাগানের শ্রমিক প্রদীপ পাসী ও রাজু গৌড় জানান, সদর উপজেলার একাটুনা ইউনিয়নের বিরাইমাবাদ এলাকার কাউয়াদিঘি হাওরে বোরো আবাদ করে সব হারিয়ে সর্বশান্ত হয়েছেন তারা কয়েকজন। তাদের নাম কেউ ক্ষতিগ্রস্তের তালিকায় দেয়নি।
মৌলভীবাজার সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নাগিব মাহফুজ সমকালকে বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা প্রস্তুতের জন্য দু’দিন সময় বেঁধে দেওয়া হয়। তখন প্রচণ্ড বৃষ্টি থাকায় চেয়ারম্যান-মেম্বারের সহযোগিতায় তালিকা তৈরি করেন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা। মেম্বার-চেয়ারম্যানদের দেওয়া তালিকায় অনিয়ম থাকলে তদন্ত করে ক্ষতিগ্রস্ত নয় এমন কৃষকের নাম বাদ দিয়ে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তের নাম যুক্ত করা হবে।

আরও পড়ুন

×