ডোলে জড়িয়ে আছে নারীর শ্রম আর স্বপ্ন
পাবনার বেড়া উপজেলার শেখপাড়া মহল্লায় ডোল তৈরিতে ব্যস্ত নারী শ্রমিকরা। ছবি: সমকাল
সাঁথিয়া (পাবনা) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১১ মে ২০২৬ | ০৭:২২
ধান কাটা, মাড়াই আর শুকানোর মৌসুম এলেই যেন নতুন প্রাণ ফিরে পায় পাবনার সাঁথিয়া ও বেড়া উপজেলার গ্রামীণ জনপদ। বিশেষ করে বেড়া পৌরসভার শেখপাড়া মহল্লায় এ সময় ব্যস্ত হয়ে ওঠেন নারীরা। কৃষকের ঘরে ধান ওঠার সঙ্গে সঙ্গে তারা মনোযোগ দেন ঐতিহ্যবাহী বাঁশের তৈরি সংরক্ষণ পাত্র ‘ডোল’ তৈরিতে।
বাংলার কৃষিভিত্তিক সংস্কৃতিতে ডোল একটি পরিচিত উপকরণ। আধুনিক সংরক্ষণ পদ্ধতি এলেও এখনও অনেক কৃষকের কাছে ডোলই নিরাপদ আশ্রয় ধানের জন্য। গোলাকার এই ডোল সাধারণত তিন থেকে পাঁচ ফুট উঁচু হয় এবং এতে ছয় থেকে ২০ মণ পর্যন্ত ধান রাখা যায়। ঘরের এক কোণে নিভৃতে থাকা এই ডোল যেন কৃষকের পরিশ্রমের ফসলকে সযত্নে আগলে রাখে।
শেখপাড়া মহল্লার নারী শ্রমিকদের জীবনের গল্প যেন মিশে আছে প্রতিটি ডোলের বাঁশের বুননে। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত টানা পরিশ্রম করলেও তাদের মুখে নেই ক্লান্তির ছাপ। বরং নিজের উপার্জনে সংসারে সহযোগিতা করতে পারার আনন্দই তাদের বড় প্রাপ্তি। সকালে দেখা যায় বিভিন্ন বয়সী নারীরা দল বেঁধে ডোল তৈরিতে ব্যস্ত। কেউ বাঁশ কাটছেন, কেউ শলা প্রস্তুত করছেন, আবার কেউ নিপুণ হাতে ডোল বুনছেন। বাড়ির উঠান, বারান্দা কিংবা গাছের ছায়া–যেখানে সুযোগ পাচ্ছেন সেখানেই চলছে কাজ। প্রায় ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই মহল্লার নারীরা এ পেশার সঙ্গে যুক্ত।
শেখপাড়া মহল্লার রূপা খাতুন বলেন, ‘আগে স্বামীর আয়ের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করতে হতো। এখন ডোল তৈরি করে নিজের হাতখরচ চালানোর পাশাপাশি সংসারেও সাহায্য করতে পারছি।’ রেখা বেগম বলেন, ‘একটা বড় ডোল বানাতে অনেক সময় লাগে। কিন্তু বিক্রি হলে ভালো লাভ হয়। এই আয় দিয়েই ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার খরচ চালাই।’ ফুলমতি খাতুন বলেন, ‘ডোল বানানো শুধু কাজ না, এটা আমাদের পুরোনো ঐতিহ্য। ছোটবেলা থেকে মায়ের সঙ্গে বসে বসে শিখেছি। এখন নিজের মেয়েকেও শেখাচ্ছি।’
জানা গেছে, ২০০ পরিবারের মধ্যে অন্তত ১৮০টি পরিবারের নারীরা ডোল তৈরির কাজে যুক্ত। বছরের অন্য সময় তারা বাঁশের চাটাইসহ বিভিন্ন সামগ্রী তৈরি করলেও বোরো মৌসুমে ডোলই হয়ে ওঠে প্রধান আয়ের উৎস। এই দুই-তিন মাসেই তারা সারাবছরের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি আয় করতে সক্ষম হন।
স্থানীয় হাটগুলোতেও এখন ডোলের সমারোহ। আকারভেদে প্রতিটি ডোল ৬০০ থেকে এক হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বোয়াইলমারী হাটে আসা কৃষক শহীদ আলী জানান, চার বিঘা জমিতে উৎপাদিত ১১০ মণের বেশি ধানের একটি অংশ সংরক্ষণের জন্য তিনি দুটি বড় ডোল কিনেছেন।
স্থানীয় মৈত্রবাঁধা মহিলা সমবায় সমিতির সভাপতি শিখা রাহা সমকাল প্রতিবেদককে বলেন, প্রাচীন ঐতিহ্য আর আধুনিক জীবনের সংযোগে ডোল আজও টিকে আছে গ্রামীণ জীবনের অংশ হয়ে–ধানের সঙ্গে যেমন কৃষকের মায়া, তেমনি ডোলের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নারীর শ্রম, দক্ষতা আর স্বপ্নের গল্প। ডোলের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ধানের ভালো ফলন হলে শুধু কৃষক নয়, ডোল তৈরি করা নারীরাও লাভবান হন। এই শিল্প তাদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বীর পথ তৈরি করছে। এ শিল্প টিকিয়ে রাখতে পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।
- বিষয় :
- পাবনা
