ঢাকা রোববার, ২১ জুন ২০২৬

বিএসএফের গুলিতে দুই মৃত্যু

সীমান্তের তিন গ্রামজুড়ে নিস্তব্ধতা

সীমান্তের তিন গ্রামজুড়ে নিস্তব্ধতা
×

ছবি: ফাইল

মো. সোলেমান খান, কসবা (ব্রাহ্মণবাড়িয়া)

প্রকাশ: ১১ মে ২০২৬ | ০৭:৩৩

‘গ্রামের অধিকাংশ ছেলে রাতের আঁধারে মালপত্র টানতে চলে যায়। বড় বড় চোরাকারবারিরা ছেলেদেরকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়। পুলিশ, বিজিবি, বিএসএফ সবাই মিলেই চোরাকারবারিদের সুযোগ করে দেয়। তাহলে কেন আবার জীবন কেড়ে নেয়?’ ক্ষোভের সুরে কথাগুলো বলছিলেন কসবার ধ্বজনগর গ্রামের সাইফুল মিয়ার স্ত্রী রিনা বেগম। 

এই গ্রামের হেবজু মিয়ার ছেলে মোরছালিন ও মানিক্যমুড়ি গ্রামের নবীর হোসেন শুক্রবার গভীর রাতে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে নিহত হন। এদিন বেশ কয়েকজন আহত হয়েছিলেন। নিহত দুজনের মরদেহ শনিবার বিকেলে হস্তান্তরের পর এদিন রাতেই নিজ নিজ গ্রামে দাফন হয়েছে।  গতকাল রোববার উপজেলার গোপীনাথপুর ইউনিয়নের তিনটি গ্রামে গিয়ে জানা গেছে, আহত ব্যক্তিরা অন্য জায়গায় লুকিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। 

নবীর হোসেনের (৫৫) মা জাহেরা বেগম (৯০) পুত্র শোকে কাতর। বুক চাপড়িয়ে তিনি বলছিলেন, ছেলের আগে কেন তাঁর মৃত্যু হলো না?

কলেজছাত্র মোরছালিনের বাবা হেবজু মিয়া ঘরের দরজায় বসে ছোট ছেলের কবরের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তাঁকে সান্ত্বনা দিতে এসেছিলেন মোরছালিনের সহপাঠী হৃদয় ও জাহিদ হাসান। বন্ধুর কবর জিয়ারত করে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছিলেন তারা। ছেলের বন্ধুদের বুকে জড়িয়ে ধরে হেবজু মিয়া ফরিয়াদ করেন, যারা তাঁর ছেলেকে আঁধারে ডেকে নিয়েছে, ছেলেকে কুপথে নিয়েছে- আল্লাহ যেন তাদের বিচার করেন। হেবজু মিয়ার ভাষ্য, পাশের বাড়ির সাইফুল মিয়ার ছেলে তোফাজ্জল ও রিয়াজুল শুক্রবার রাতে তাঁর ছেলেকে ডেকে নিয়ে যান। 

সাইফুলের বাড়িতে গিয়ে কথা হয় তাঁর স্ত্রী রিনা বেগমের সঙ্গে। তিনি চোরাকারবারের সুযোগ তৈরি করে দেওয়ার জন্য পুলিশ-বিজিবি-বিএসএফকে দায়ী করেন। একই ঘটনায় গুলিবিদ্ধ ধ্বজনগর গ্রামের মুক্তার হোসেনের বাড়িতে গিয়ে পাওয়া যায় বৃদ্ধ বাবা মুলুক হোসেনকে। তিনি বলেন, শুক্রবার রাত থেকেই ছেলে বাড়িতে নাই। তিনি জানতে পেরেছেন বিএসএফের গুলিতে সে আহত হয়েছে। তবে কোথায় চিকিৎসা করছে তিনি জানেন না।

একই কথা জানালেন পাথরিয়াদ্বার গ্রামের নেহারা বেগম। তাঁর ছেলে জুবায়ের হোসেন বাবুও একই রাতে আহত হয়েছে বলে শুনেছেন। তবে কোথায় চিকিৎসা করছে জানেন না। ছেলের সঙ্গে যোগাযোগও হয়নি। নেহারা বেগম বলেন, ‘এলাকার অনেক ছেলেই রাতের বেলা মালপত্র টানে। লোভ সামলাতে পারে না। সন্ধ্যার পর ছেলেদের ঘরে রাখা যায় না। ৫০০ টাকা, ৭০০ টাকার লোভ করে জীবন শেষ।’

মানিক্যমুড়ি গ্রামের বাহার উদ্দিন (৪০) গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। তবে তিনি কোথায় চিকিৎসা নিচ্ছেন সে তথ্য জানা নেই স্ত্রী মোমেনা বেগমের। তাঁর স্বামী শুক্রবার আসরের নামাজের পর বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন জানিয়ে বলেন, কোথায় আছে কিছুই জানেন না। 

ধ্বজনগর, পাথরিয়াদ্বার, মানিক্যমুড়ি গ্রামগুলো পাশাপাশি। সীমান্ত ঘেঁষা এসব গ্রামের তিনটি পয়েন্টে নানা পণ্য চোরাচালান হয়। ধ্বজনগরের উজ্জল মিয়া বলেন, অধিকাংশ মানুষই প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে চোরাচালানে জড়িত। শুক্রবার রাতে দুটি গ্রুপের ৩৫-৪০ জন মাছের পোনা আনতে গিয়েছিল। এদের মধ্যে দুজন মারা গেল। তিন-চারজন আহত হলো। বাকি মানুষগুলো কোথায় হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। 

অভিযানে আটক ২

এদিকে গতকাল গোপীনাথপুর ইউনিয়ন এলাকা থেকে দুই চোরাকারবারিকে আটক করেছে পুলিশ। তারা হলেন– মালু মিয়া (৩৮) ও মনির হোসেন (৩৫)। কসবা থানার ওসি নাজনীন সুলতানা বলেন, সীমান্তে অবৈধ কার্যক্রম রোধে পুলিশের অভিযান চলছে। সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে।

আরও পড়ুন

×