‘যে রইদ দের, পানি কমাইয়া দিলে মাইনসে কিছু ধান আনতো পারলোনে’
মহাসিং নদীর পাগলা বাজারের উত্তর মাথায় নদী পাড়ে বৈঠা দিয়ে হাওরের পানি চিহ্নিত করে দেখাচ্ছিলেন মাঝি রফিক মিয়া। সোমবার বিকেল পাঁচটায় তোলা- সমকাল
পঙ্কজ দে, সুনামগঞ্জ
প্রকাশ: ১১ মে ২০২৬ | ১৯:২০
ছয় দিনের কড়া রোদে ভরাট হওয়া সুনামগঞ্জের নদ-নদীর পানি অনেকটা কমেছে। কৃষকরা বলছেন, ভরাট হওয়া হাওর থেকে নদীর পানির উচ্চতা আড়াই থেকে তিন ফুট নিচে নেমেছে। এমতাবস্থায় ডুবে থাকা পাকা ধানের ওপর থেকে পানি কিছুটা কমানো গেলে কিছু ধান কেটে আনতে পারবেন তারা। তাতে ক্ষয়ক্ষতির অন্তত ২০ থেকে ২৫ শতাংশ কমানো সম্ভব।
সোমবার বিকেলে দেখার হাওরের (সুনামগঞ্জের চার উপজেলার কৃষকেরা জমি চাষ করেন যে হাওরে) পানি নামার পথ মহাসিং নদীতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, নদীর পানি হাওরের পানি থেকে অন্তত দুই হাত নিচে রয়েছে। নদীপাড়ের পাগলা বাজার থেকে কাদিরপুর পর্যন্ত মানুষ পারাপার করেন কাদিরপুর গ্রামের রফিক মিয়া। তিনি খেওয়া নৌকায় বসে পাড়ের একটি অংশ বৈঠা দিয়ে চিহ্নিত করে দেখিয়ে বলেন, ‘ছয়দিন আগে এখানে কমপক্ষে দুই-তিন হাত ওপরে পানি ছিল, এখন পানি নিচে নেমেছে। কিন্তু হাওরের পানিতো ওইভাবে কমেনি।’
রফিক বলেন, ‘যে রইদ (রোদ) দের, হাওরের পানি কমাইয়া (কমিয়ে) দিলে, মাইনসে (কৃষক) টাইন্না-টুইন্না (টেনে-টুনে) কিছু ধান আনতো পারলোনে।’
শান্তিগঞ্জ উপজেলার জয়কলস ইউনিয়নের আস্তমা গ্রামের কৃষক কে এম ফখরুল ইসলাম দেখার হাওরে চাষাবাদ করেছিলেন। তিনি বলেন,‘আমাদের বেশিরভাগ পাকা জমিইতো পানির নিচে ডুবেছে। পানির নিচে থেকে গেলে কয়েকদিনে ধান নষ্ট হবে, তবে হাওরের পানি কিছুটা কমানো গেলে কিছু ধান আনান যেত। এখন হাওরে সাতার পানি, বুকসমান পানি হলেও হাওরপাড়ের কৃষকরা কিছু ধান তুলে আনতে পারত।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার লক্ষণশ্রী ইউনিয়নের গোবিন্দপুরের কৃষক আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘সকলে একমত হয়ে সিদ্ধান্ত নিলে, আগের মতো বাঁধ কেটে পানি ছাড়তে আমরা উতারিয়া বাঁধে যেতে পারি।’ তার ভাষ্য, কিছুটা পানি বের হলেও ধান কাটা যাবে। আবার পানি উল্টো ঢুকলেও আাঁখি দিয়ে (চিরুনির ন্যায়) কিছু ধান তুলে আনতে পারবেন গরিব কৃষকরা।
শান্তিগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ফারুক আহমদ বললেন,‘আস্তমার কৃষকরা আমাকে বলেছেন, উতারিয়া বাঁধ কেটে কিছু পানি নামানো গেলে তাদের বেশ উপকার হবে। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখলে কৃষকদের উপকার হবে। সিদ্ধান্ত নিতে বিলম্ব করলে লাভ হবে না।’
শাল্লা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কৃষক নেতা ছত্তার মিয়া বললেন, ভেড়াডহরের হাওর থেকে পাশের দাড়াইন নদীর পানি আড়াই ফুট নিচে। সকালে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে হাওরের কৃষকরা বলেছেন, হাওরপাড়ের কান্দিগাঁওয়ের পাশের নৈল্লার খালের বাঁধ এবং হাওরের মাঝখানে থাকা চ্যাপটার হাওরের বাঁধ কেটে দিলে ডুবে থাকা দুই থেকে আড়াইশ হেক্টর জমির ধান কেটে আনা সম্ভব। অর্থাৎ ২৫ ভাগ ক্ষতি কমাতে পারবে কৃষকরা।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পিয়াস চন্দ্র দাস বললেন, ‘হাওরে অনেকের খড় আছে, এজন্য কিছুটা দুশ্চিন্তা আছে। বিকেলে সরেজমিনে দেখে সকলের মতামতে সিদ্ধান্ত দেওয়া হবে।’
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বললেন, ‘এখন পানি হাওরে ঢুকলেও বড় ধরনের সর্বনাশের কিছু নেই। বাঁধ কেটে হাওরের পানি নদীতে বের করে দেওয়ার মতো হলে এবং কৃষকরা যদি উপকৃত হন এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে।’
