ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

মাছ চাষের জন্য লিজ নিয়ে রেলের জলাশয় ভরাট, প্লট বিক্রি

মাছ চাষের জন্য লিজ নিয়ে রেলের জলাশয় ভরাট, প্লট বিক্রি
×

নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলায় রেলওয়ের জলাশয় লিজ নিয়ে ভরাট করে প্লট আকারে বিক্রি সমকাল

 আমিরুল হক, নীলফামারী

প্রকাশ: ১২ মে ২০২৬ | ০৭:৪৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলায় রেলওয়ের একটি বড় জলাশয় ভরাট করে প্লট আকারে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। মাছ চাষের জন্য ইজারা নেওয়া হলেও মাহমুদ আলী নামে এক ব্যক্তি মাটি ফেলে জলাশয়ের অন্তত অর্ধেক অংশ ভরাট করে ফেলেছেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। ইতোমধ্যে সেখানে ঘর নির্মাণ করে প্লট বিক্রির মাধ্যমে কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে বলেও দাবি করা হচ্ছে। এতে জলাবদ্ধতা বাড়ার পাশাপাশি অগ্নিকাণ্ডের সময় পানির সংকটসহ জননিরাপত্তা  প্রচণ্ড ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

দখল-ভরাটের কবলে জলাশয়
ব্রিটিশ আমলে নির্মিত রেলওয়ের এই জলাশয়টি শহরের গোলাহাট ১ নম্বর অবাঙালি ক্যাম্প-সংলগ্ন খানকাহ মসজিদের সামনে অবস্থিত। দীর্ঘদিন ধরে এটি আশপাশের কয়েক হাজার মানুষের পানি নিষ্কাশনের প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। একই সঙ্গে অগ্নিকাণ্ডের সময় ফায়ার সার্ভিস এখান থেকে পানি নিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণ করে। অথচ জনগুরুত্বপূর্ণ জলাশয়টির দুই 
পাশ থেকে ধাপে ধাপে মাটি ফেলে ভরাট করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে সেখানে ১০ থেকে ১২টি আধাপাকা ও পাকা কক্ষ নির্মাণ করে বিক্রি করা হয়েছে। বর্তমানে টিন দিয়ে ঘিরে নতুন করে আরও ঘর নির্মাণের প্রস্তুতি চলছে।
সৈয়দপুর ফায়ার সার্ভিসের স্টেশনমাস্টার আবু হাশেম বলেন, এ শহরে প্রায় তিন লাখ মানুষের বসবাস। রয়েছে ২২টি পাকিস্তানি ক্যাম্প ও অসংখ্য ছোট বড় মিল-কারখানা। কিন্তু সরকারিভাবে অগ্নিনির্বাপণের জন্য জলাধার নেই। এখন রেলের জলাশয়টি না থাকলে অগ্নিকাণ্ড মোকাবিলা কঠিন হয়ে পড়বে। 

বাধা দিলে হুমকি স্থানীয়দের 
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর থেকে জলাশয়টি ভরাট শুরু হয়। এখন পর্যন্ত রেলের ৫০ শতাংশ জায়গা মাহমুদ আলী লিজ নিয়ে ৯ জনের কাছে বিক্রি করেছেন। তবে তারা নিজেদের মাহমুদ আলীর আত্মীয় পরিচয় দিচ্ছেন। জায়গা কেনার কথা অস্বীকার করেছেন। তাদের বাধা দিয়েও কোনো কাজ হয়নি। বাধ্য হয়ে দেড় শতাধিক বাসিন্দা গণস্বাক্ষর সংগ্রহসহ লিখিতভাবে ১০ মার্চ সংসদ সদস্য ও রেলওয়ের ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তাকে জানিয়েছেন। 

স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ আশরাফ বলেন, ইজারার আড়ালে পুরো জলাশয় দখল করে প্লট আকারে বিক্রি করা হচ্ছে। প্রতিবাদ করলে হুমকি দেওয়া হয়। ভরাটের কারণে জলাবদ্ধতা বাড়ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা রাজিয়া সুলতানা আক্ষেপ করে বলেন, জলাশয় ভরাটের প্রভাব শিগগিরই আমরা দেখতে পাব। বৃষ্টির পানি নামতে পারবে না, ঘরে-রাস্তায় পানি উঠবে। এ ছাড়া প্রাকৃতিক পরিবেশের ক্ষতিসহ বেহাত হবে রেলের প্রায় ৫ কোটি টাকার সম্পদ। তবে হুমকি-ধমকির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মাহমুদ আলী। তিনি দাবি করেন, বৈধভাবে ইজারা নিয়ে নিজের প্রয়োজনে কিছু অংশ ভরাট করছেন। তবে প্লট আকারে বিক্রির বিষয়ে স্পষ্ট কোনো জবাব দিতে পারেননি।

অভিযোগ দিয়েও মিলছে না প্রতিকার
পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী জলাধার ভরাট বা শ্রেণি পরিবর্তন দণ্ডনীয় অপরাধ হলেও সৈয়দপুরে তার ব্যত্যয় ঘটছে। অভিযোগের পরও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে জলাশয়, বাড়ছে ঝুঁকি। পরিবেশ নিয়ে কাজ করছে এমন সংগঠনসহ স্থানীয়দের মনে প্রশ্ন–সময় থাকতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে, নাকি পুরো জলাশয়ই হারিয়ে যাবে?
রিভাইন পিপলের পরিচালক অধ্যাপক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, পুকুর বা জলাশয় ভরাটের কিছু বিধিমালা আছে। চাইলেই সরকারি জলাশয় ভরাট করা যায় না। কেউ এমন করলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার দায়িত্ব হবে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া।
স্থানীয় সংসদ সদস্য হাফেজ আবদুল মোনতাকিম জানান, অভিযোগ পেয়ে সরেজমিনে জায়গাটি পরিদর্শন করেছেন। ইজারাটি বাতিল করে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে রেলের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।  
রেলওয়ের ভূ-সম্পত্তি বিভাগের কানুনগো মহসিন আলী জানান, জলাশয় ভরাট বা বিক্রির কোনো সুযোগ নেই। বিষয়টি যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রেলওয়ে পূর্ত বিভাগের সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ‘সরেজমিনে তদন্ত করে প্রমাণ পাওয়া গেলে ইজারা বাতিলের জন্য সুপারিশ করা হবে।’

আরও পড়ুন

×