চট্টগ্রামে হাম থেকে সুস্থ হয়ে ফের অসুস্থ হচ্ছে শিশু
চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়
শৈবাল আচার্য্য, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ১২ মে ২০২৬ | ০৮:৫০ | আপডেট: ১২ মে ২০২৬ | ১১:৪৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
আট মাসের শিশু আইয়ানের হঠাৎ তীব্র জ্বর আসে, সঙ্গে কাশি। এক দিনের ব্যবধানে বাড়ে শ্বাসকষ্ট। স্থানীয় এক চিকিৎসক তাকে দেখে ওষুধ দেন। তাতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়, শরীরে দেখা দেয় লালচে ফুসকুড়ি। ভর্তি করাতে হয় হাসপাতালে। এক সপ্তাহের চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে তাকে নিয়ে বাড়ি ফেরে পরিবার। এর তিন দিনের মাথায় ফের নিউমোনিয়াসহ নানা জটিলতা দেখা যায় আইয়ানের শরীরে। তাকে নিয়ে আবার ছুটতে হয় হাসপাতালে। শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটায় নিতে হয় আইসিইউতে। দুদিনের মাথায় সে পাড়ি জমায় না ফেরার দেশে।
এমন করুণ পরিণতি শুধু আইয়ানের নয়; হামের কারণে তার মতো অনেক শিশুই সুস্থ হওয়ার পর আবারও অসুস্থ হচ্ছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল, ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতাল, চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালসহ কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতালে হামে অন্তত ১১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচ শিশুকে আইসিইউতে ও চার শিশুকে এইচডিইউতেও ভর্তি করতে হয়েছিল। এসব শিশু টানা কয়েক দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর হাম থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরে। পরে কয়েক দিনের ব্যবধানে তারা আবারও অসুস্থ হওয়ায় ভর্তি হতে হয় হাসপাতালে।
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য বলছে, চট্টগ্রামে দিন দিন বাড়ছে হামে আক্রান্ত শিশু। গতকাল সোমবার এক দিনেই রেকর্ড ৫৭ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এ পর্যন্ত ভর্তি হয়েছে এক হাজার ২৭৯ জন। বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছে ২৪৯ জন। প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ শিশুকে পিআইসিইউ ও এইচডিইউতে স্থানান্তর করতে হচ্ছে। বাড়তি রোগীর চাপ সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে চিকিৎসক, নার্সসহ সংশ্লিষ্টদের।
চিকিৎসক বলছেন, বাড়ি ফেরার কয়েক দিনের ব্যবধানে আবারও অনেক শিশুর শরীরে নানা অস্বাভাবিকতা দেখা দিচ্ছে। পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার আগে হাসপাতাল ছাড়া, পরবর্তীতে সঠিক চিকিৎসা ও যত্নের অভাবে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও পুষ্টিহীনতার মতো জটিলতা দেখা দিচ্ছে। হাম থেকে সুস্থ হওয়ার পর শিশুর শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ফিরে আসতে এক থেকে দেড় মাস সময় লাগে। তবে এ সময়ের মধ্যে যদি আবারও কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়, তাহলে তা শিশুর শরীরে ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। যে কারণে বাড়ে মৃত্যুঝুঁকি।
চমেক হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মুসা বলেন, ‘হাম ও হামের লক্ষণ নিয়ে আক্রান্ত শিশুর হার বাড়ছেই। এমন অনেক শিশু পাচ্ছি যারা চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার পর আবারও অসুস্থ হচ্ছে। এর মধ্যে কিছু শিশুর শরীরে নিউমোনিয়াসহ নানা জটিলতা থাকায় আইসিইউতে ভর্তি করাতে হচ্ছে। ১০ মাসের কম বয়সী শিশুর এমনটা বেশি হচ্ছে। যাদের একটি অংশ একডোজ টিকাও পায়নি।’
মা ও শিশু হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. ফাহিম হাসান রেজা বলেন, ‘হাম শিশুর শরীরকে দুর্বল করে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে ফেলে। যে কারণে ছোটখাটো ভাইরাসে হাম আক্রান্তরা সহজেই কাবু হয়ে যায়। তাই সুস্থ হয়ে দ্বিতীয়বারের মতো আবারও অসুস্থ হয়ে পড়ছে শিশুরা।’
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে সুস্থ হওয়া শিশুদের ব্যাপারে মা-বাবার বাড়তি সচেতনতা জরুরি। বাড়ি ফেরার পর শিশুদের পর্যাপ্ত ভিটামিন ও প্রোটিনযুক্ত খাবার দিতে হবে। পাশাপাশি অন্তত দেড় মাস চিকিৎসকের পরামর্শ ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। অবহেলা করলে ঘটতে পারে বিপদ।’
