কিশোরগঞ্জের হাওর
এক মুঠো ধানও ছাড়তে চান না হাওরের নারীরা
রোদ উঠতেই ধান রক্ষায় ব্যস্ত নারীরা। মঙ্গলবার কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলার কলমা গ্রামের জেলেপাড়ায় সমকাল
বিজয় কর রতন, মিঠামইন (কিশোরগঞ্জ)
প্রকাশ: ১৪ মে ২০২৬ | ০৭:৫৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
কিছুদিন চলেছে টানা বর্ষণ। সেই সঙ্গে উজান থেকে আসা ঢলে তলিয়েছে কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ বোরো জমি। অবশেষে যখন দেখা মিলেছে রোদের, তার প্রতিটি মুহূর্ত যেন কাজে লাগাতে ব্যস্ত জেলার অষ্টগ্রাম, ইটনা ও মিঠামইনের চাষিরা। তাদের সঙ্গে প্রতি খলায় প্রতি মুঠো ধান বাঁচাতে লড়ছেন নারীরা।
মঙ্গলবার সকাল থেকে সরেজমিন অষ্টগ্রামের দেওঘর, কলমা, কাস্তুল ও আবদুল্লাহপুরের বিভিন্ন খলা, অলওয়েদার সড়কের দুই পাশ ও উঁচু জায়গায় ধান শুকাতে দেখা গেছে শত শত নারীকে। তাদের কেউ ধান উল্টে দিচ্ছেন, কেউ বাতাসে উড়িয়ে ময়লা পরিষ্কার করছেন। আবার কেউ বস্তা ভর্তি করছেন শুকানো ধান দিয়ে। পুরুষদের পাশাপাশি শত শত নারীর এই পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে ফুটে উঠেছে হাওরপারের সংগ্রামী জীবনের চিত্র।
ধান বাঁচাতে লড়াইয়ে ব্যস্ত নারী অনেকের সঙ্গী হিসেবে এসেছে তাদের শিশু সন্তান। ঘরের কাজ সামলে তাদের একটাই চিন্তা, যেভাবেই হোক ধান শুকিয়ে ঘরে তুলতে হবে। দেওঘর গ্রামের গৃহবধূ আয়েশা খাতুন বলেন, ‘কয়দিনের বৃষ্টিতে সব শেষ হইতে নিছিলো। আইজ রোদ পাইয়া খলায় আইছি। এই ধান বাঁচাইতে না পারলে সংসার চালানো কষ্ট হইয়া যাইব।’
কলমা গ্রামের জেলেপাড়ার কিষানি রীতা রানী দাস এদিন সকাল থেকেই ধান উল্টেপাল্টে দিচ্ছিলেন। তিনি বলেন, ‘রোইদ কতক্ষণ থাকব– কেডা জানে! ধান না শুকাইলে খাইমু কী? তাই যতখান পারি শুকাইতেছি।’
রোদের দেখা মিললেও কৃষকের মন থেকে দুশ্চিন্তা কাটেনি। গতকাল বুধবার জানা গেছে, আগের ২৪ ঘণ্টায় নদ-নদীর পানি আবার কিছুটা বেড়েছে। ফলে জমির ধান নিয়ে নতুন করে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। অষ্টগ্রামের অনেক নিচু জমি এখনও তলিয়ে আছে। ফলে কোথাও কোথাও পানির মধ্যেই ধান কাটতে হচ্ছে তাদের।
ধান কাটার মধ্যে নতুন উপদ্রব হিসেবে দেখা দিয়েছে জোঁক। মিঠামইনের ভরাজি বিল ও শিংরাকান্দা বিলে ধান কাটতে গিয়ে অনেক কৃষক ও কৃষি শ্রমিকের শরীরেই জেঁকে বসছে জোঁক। ভয়ে অনেক শ্রমিক পানিতে নামতে চান না। তলিয়ে যাওয়া জমির ধান হারভেস্টার দিয়ে কাটা যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে বিকল্পের খোঁজ করছেন কৃষক। শ্রমিক সংকট দেখা দেওয়ায় মজুরিও বেড়েছে। এমন বহুমুখী চাপে পড়ে ধান রক্ষা নিয়ে চাষিরা দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।
ইব্রাহিম মিয়া নামে এক চাষি বলেন, আর দুই-তিন দিন রোদ থাকলে অনেক ধান রক্ষা করা সম্ভব হবে। কিন্তু এর মধ্যে নতুন করে বৃষ্টি এলে তাদের বড় ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।
নিকলী আবহাওয়া অফিস সূত্রে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জানা যায়, আগের ২৪ ঘণ্টায় ৬৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় এই অফিসের কর্মকর্তা মো. আলতাফ হোসেন জানান, ২৪ ঘণ্টায় তারা ৩ দশমিক ০২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড
করেছেন। ১৬ মে পর্যন্ত হালকা ও মাঝারি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, অতিবৃষ্টি ও উজানের ঢলে কিশোরগঞ্জে প্রায় সাড়ে ১২ হাজার হেক্টর জমি তলিয়ে গেছে। অষ্টগ্রাম ও ইটনা উপজেলা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত।
অষ্টগ্রাম উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা অভিজিৎ পণ্ডিত বুধবার বলেন, এ পর্যন্ত উপজেলার হাওরগুলোতে ৯২ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ২-৩ দিনের মধ্যে শতভাগ কাটা শেষ হবে বলে তিনি আশাবাদী। তবে দুর্যোগের কারণে মোট ৩ হাজার ১৭৪ হেক্টর জমির ধানের ক্ষতি হয়েছে।
